রংপুরে চীনফেরত দুই বাংলাদেশির মধ্যে করোনাভাইরাস সন্দেহে যে একজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল, পরীক্ষায় তার দেহে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। রংপুরে মেডিকেলে চিকিৎসা নেওয়া অন্য জনকে আগেই করোনাভাইরাসমুক্ত ঘোষণা করেছিল সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, সন্দেহ হওয়ায় রংপুর থেকে
যাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এনে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল, ওই ব্যক্তির শরীরে করোনাভাইরাস ছিল না। আমরা বলেছিলাম তার মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। তারপরও আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তাকে আইসোলেশনে রেখেছিলাম। তার নমুনা পরীক্ষা করেছি। তাতে দেখা গেছে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন। এমনকি গত ২১ জানুয়ারি থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত আইইডিসিআর ৫৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারও শরীরে করোনাভাইরাস পায়নি বলেও জানান পরিচালক।
আইইডিসিআর জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরে এখন পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশি করোনাভাইরাস আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। প্রথম যিনি শনাক্ত হয়েছিলেন দ্বিতীয় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তি তার সংস্পর্শেই ছিলেন। এই দুই রোগীর সংস্পর্শে ছিলেন এমন ১৯ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে সিঙ্গাপুর সরকার। এর মধ্যে ১০ জনই বাংলাদেশি।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, সিঙ্গাপুরে যেহেতু দুজন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন, সে কারণে সেখানে আমাদেরও বিশেষ নজর রয়েছে। তাদের চিকিৎসার ব্যয় সিঙ্গাপুর সরকার বহন করবে।
পরিচালক আরও জানান, তারা দুজনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে একজন আইসিইউতে রয়েছেন, আরেকজন সাধারণভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুর সরকার নিয়মিতভাবে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস ও দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। আর দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আইইডিসিআরের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে।
করোনাভাইরাসে বাংলাদেশি শনাক্ত হওয়ার কারণে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, আলাদা করে এখনো কোনো নির্দেশনা দিচ্ছি না। যদিও সব এয়ারলাইনসকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে এসেছি, তারপরও নজর দিচ্ছিলাম চীন থেকে আসা ফ্লাইটের বিষয়ে। এখন সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটের বিষয়েও আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি।
সম্প্রতি যারা সিঙ্গাপুর থেকে এসেছেন বা এখনো আসছেন তাদের প্রতি অধ্যাপক ফ্লোরা অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তারা যেন যথাসম্ভব নিজেদের ঘরের মধ্যে থাকেন, বিশেষ করে যদি করোনা আক্রান্ত কোনো রোগীর সংস্পর্শে এসে থাকেন তাহলে তিনি যেন হোম বা সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকেন।
আইইডিসিআরের তথ্যমতে, চীনের স্বাস্থ্য কমিশন গতকাল বুধবার পর্যন্ত যে তথ্য দিয়েছে তাতে এ পর্যন্ত চীনে এই ভাইরাসে মারা গেছে ১ হাজার ১১৩ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের নতুন নামকরণ করেছে কোভিড-১৯ (ঈঙঠওউ-১৯)। করোনা থেকে সিও, ভাইরাস থেকে ভিআই ও ডিজিজ থেকে ডি। আর যেহেতু এটা ২০১৯ সালে শনাক্ত হয়েছে তাই শেষে ১৯ দিয়ে লেখা হচ্ছে।
আইইডিসিআরের হটলাইনে ২৪ ঘণ্টায় ১৩০টি ফোনকলের মধ্যে নতুন এই ভাইরাস নিয়ে কল এসেছে ১০৭টি। এ ছাড়া ৫৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছে তিনটি। তবে এসব নমুনার মধ্যে এখন পর্যন্ত নতুন এই করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আমাদের একজন রোগী আইসোলেশনে ছিলেন, তার মধ্যেও করোনার উপস্থিতি নেই। যদিও তার মধ্যে করোনার কোনো লক্ষণ-উপসর্গ ছিল না, তারপরও অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তার পরীক্ষা করা হয়েছে।
হজক্যাম্প থেকে রিলিজ ১৫ ফেব্রুয়ারি : চীন থেকে ফেরা ৩১২ জনের মধ্যে যাদের আশকোনার হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে, তাদের সবাই সুস্থ আছেন বলে জানান আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, সেখানে তাদের ১৫ জানুয়ারি বিকেল পর্যন্ত রাখা হবে। তারপর সেখান থেকে কীভাবে তাদের রিলিজ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মৈত্রী এক্সপ্রেসেও হেলথ স্ক্রিনিং : করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতার অংশ হিসেবে ঢাকা-কলকাতা রুটে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক। তিনি জানান, বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌবন্দরের পর এবার রেলস্টেশনেও বিদেশফেরত যাত্রীদের হেলথ স্ক্রিনিং হচ্ছে। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে গত মঙ্গলবার থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে। মৈত্রী এক্সপ্রেস বেনাপোল হয়ে এলেও সেখানে কোনো যাত্রী নামেন না। তারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে নামেন। গতকাল বুধবার থেকে তাদেরও স্ক্রিনিং করা হচ্ছে।
ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে সপ্তাহে পাঁচ দিন চলাচল করে মৈত্রী এক্সপ্রেস। মঙ্গল, বুধ, শুক্র, শনি ও রবিবার ট্রেনটি ঢাকা ছেড়ে যায়। আর সোম, মঙ্গল, বুধ, শুক্র ও শনিবার কলকাতা থেকে ছেড়ে আসে।
আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকুন : করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। তারা বলেছেন, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের সব ব্যবস্থা সরকার নিয়ে রেখেছে। এখন প্রয়োজন সতর্ক থাকা।
গতকাল বুধবার ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ও চিকিৎসার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা গ্রহণ করেছি। এ দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগী এখনো পাওয়া যায়নি। খুব দৃঢ়তার সাথে বলতে চাচ্ছি, এ বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই এবং আমাদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নেওয়া আছে। সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত বাংলাদেশিদের চিকিৎসাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আমরা দোয়া করি যাতে তারা দ্রুত সুস্থ হন। আমাদের অনেক লোক সিঙ্গাপুরে বসবাস করে, তারা যাতে সাবধানে থাকে, তারা যেন আরও সতর্ক হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নির্দেশ দেওয়া রয়েছে, চীন থেকে এলে যে রকম নজরদারি দেওয়া হয়ে থাকে, সিঙ্গাপুর থেকে এলেও যাতে সে রকম নজরদারি করা হয়। ঢাকায় তিনটি হাসপাতালে আইসোলেটেড ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে, চিকিৎসক, নার্সদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকার উত্তরার কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ২০ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ ইউনিট প্রস্তুত করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেছেন, কোভিড-১৯ ( করোনাভাইরাস) ৩২-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নিষ্ক্রিয় হয়। বাংলাদেশের তাপমাত্রা দু-এক দিনের মধ্যে ৩২ ডিগ্রিতে উঠে যাবে। সুতরাং এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক প্রকাশিত ট্রাভেল ম্যাগাজিন ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট রয়েছে তাও হোয়াংহোতে। সেখানে কোভিড-১৯ নেই। এরপরও প্রতিনিয়ত মানুষের আসা-যাওয়া রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুই থেমে নেই।
বিমানমন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব নাগরিক চীনে আতঙ্কিত ছিল তাদের ফেরত এনে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে এই ভাইরাস নেই। আমাদের যে বিমানটি চীনে গিয়েছিল, সে বিমানটি জার্ম-ফ্রি হয়েছে। সেই বিমানের ক্রু যারা ছিলেন, তারা ১৪ দিন পর্যন্ত বিশ্বের অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন না।
চীন থেকেই পণ্য আমদানির আহ্বান চীনা রাষ্ট্রদূতের : করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের চীনের মার্কেট পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিনমিং। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের চীনের মার্কেটে থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি জানি তৈরি পোশাকশিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল চীন থেকে আসে। এই সাপ্লাই চেনে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে আমি মনে করি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে করোনাভাইরাস নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
বাণিজ্যে কিছুটা শ্লথগতির কথা স্বীকার করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এর দুটি কারণ আছে। একটি হচ্ছে চীনের নববর্ষ, যে সময়ে চীনারা কেউ কাজ করে না। এর সঙ্গে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে ছুটি কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়েছে।’ তবে উৎপাদন ও বাণিজ্য স্বাভাবিক হয়ে উঠবে আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, চীনের প্রধান শিল্পনগরীতে আবার কাজ শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, তারা বিচক্ষণতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছে। অন্য অনেক দেশ যেমন করেছে, বাংলাদেশ সে রকম কিছু করেনি।