৫৭ বছর পর কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের বয়স গিয়ে ঠেকেছে ৫৭ বছরে। দীর্ঘ সময়ে এক হাজার শয্যার এ হাসপাতাল পেয়েছে অনেক কিছুই। শুধু ছিল না একটি ক্যাথল্যাব মেশিন। ফলে রোগীদের হার্টের এনজিওগ্রাম ও রিং পরানোর জন্য ছুটতে হতো ঢাকায়। হৃদরোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না থাকায় অনেক রোগীকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। বছরের পর বছর এমন দৈন্যদশা নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ চলতে হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা এ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগকে। এ নিয়ে ক্ষোভ- হাপিত্যেশের অন্ত ছিল না। অবশেষে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ তলায় হৃদরোগ বিভাগে আজ শনিবার চালু হতে যাচ্ছে কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাবের। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কোনো অতিথি ছাড়াই এ কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাবের উদ্বোধন করবে।

এদিকে কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব চালুর ফলে এখন থেকে আর হৃদরোগের পরিপূর্ণ চিকিৎসার জন্য এ অঞ্চলের রোগীদের ছুটতে হবে না ঢাকায়। মরণাপন্ন অনেক রোগীর জীবন বেঁচে যাবে। আধুনিক এ ল্যাবে নামমাত্র টাকায় এনজিওগ্রাম পরীক্ষার পর এখানেই রিং পরানো ও পেসমেকার বসানোসহ প্রয়োজনে বাইপাস সার্জারি করানো যাবে। ল্যাবের কার্যক্রম শুরু হলে হার্টের যাবতীয় চিকিৎসা এখানেই করা যাবে। প্রাথমিকভাবে এ ল্যাবে আট শয্যার পোস্ট ক্যাথল্যাব ওয়ার্ডও থাকছে।

১৯৬২ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার বাইরেও সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুরের একাংশের লোকও প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে ভিড় করেন। এ হাসপাতালের নতুন ভবনের চতুর্থ তলায় হৃদরোগ বিভাগে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল একটি ক্যাথল্যাব মেশিন না থাকা। অথচ এ যন্ত্রের মাধ্যমে হার্টে এনজিওগ্রাম করে রক্তনালিতে কোনো ব্লক থাকলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে রিং পরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে মুমুর্ষূ রোগীর জীবন বেঁচে যায়।

হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মমেক হাসপাতালের ২০ শয্যার হৃদরোগ বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ১৭০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ক্যাথল্যাব মেশিন না থাকায় প্রতি মাসেই বিপুলসংখ্যক রোগীকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এতে করে ওইসব রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলেও এতদিন পাচ্ছিলেন না পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা।

মমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে হৃদরোগ বিভাগে সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) মুজিবুর রহমান ফকির এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. তুষার ভাইসহ অনেক ভিআইপি রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ক্যাথল্যাব থাকলে তাদের উন্নত চিকিৎসাসহ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেত।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনারি কেয়ার ইউনিট-সিসিইউ এবং হৃদরোগ বিভাগের আলাদা ইউনিট ও ওয়ার্ডের পাশে একই

ফ্লোরে বসানো হয়েছে ক্যাথল্যাব পোস্ট ক্যাথল্যাব ওয়ার্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সদের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা কর্নার। আট শয্যার ক্যাথল্যাব ওয়ার্ডের প্রতিটি শয্যার পাশেই রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির মনিটরসহ এনজিওগ্রাম করার পর রোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি। পর্যাপ্ত কার্ডিওলজিস্ট ও নার্স টেকনেশিয়ান ছাড়াও এজন্য ইন্টারভেনশনারিস্ট অধ্যাপক ডা. আবুল হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও একজন ইন্টারভেনশনারিস্ট নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবুল কালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাথল্যাব মেশিনের অভাবে হার্টের জরুরি কোনো সমস্যা হলেই রোগীদের ঢাকায় বা অন্যত্র ছুটতে হতো। টাকা-পয়সা খরচের পাশাপাশি মূল্যবান জীবনও চলে যেত। আমরা খুশি যে এ ভোগান্তির এখন নিরসন হচ্ছে। এটা আমাদের অনেক বড় এক প্রাপ্তি।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমান ভূঁইয়া ক্যাথল্যাবকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ময়মনসিংহবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এমএ বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব চালু হলে এনজিওগ্রাম পরীক্ষার পর রোগীদের নামমাত্র ফিতে রিং পরানো, পেসমেকার স্থাপন এবং হার্টের ভাল্ব রি-পেয়ারিসহ প্রয়োজনে বাইপাস সার্জারি করা যাবে।’

অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিবযুল বারী বলেন, ‘হাসপাতালে ওয়ানস্টপ সার্ভিস ও কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর পর ক্যাথল্যাব চিকিৎসা সেবার সুবিধা চালু ময়মনসিংহ বিভাগ ও এর আশপাশের রোগীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়ে আনবে।’