জাপানিদের গুবরে পোকা প্রেমের নেপথ্যে

আকারে ছোট হলেও নিজের ওজনের চেয়ে হাজার গুণ ভারী বস্তুকেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে গুবরে পোকা। এই পোকাটির প্রতি জাপানিদের প্রেম অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকে। কিন্তু এই প্রেমের নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু কারণ। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি অবলম্বনে লিখেছেন পরাগ মাঝি

বলিভিয়ার গুবরে পোকা শিকারি

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজ থেকে ৬০ মাইল উত্তর-পূর্বদিকে পাহাড়ি এক জঙ্গুলে এলাকা করোইকো। এখানেই তাঁবু গেড়ে বসেছেন রেইনাল্ডো জামব্রেনা। মাঝরাতে তাঁবু থেকে বের হলেন তিনি। হাতে একটি চাপাতি। জঙ্গলের ছোট ঝোপঝাড়গুলো পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে চাপাতির সাহায্যে সেগুলো পরিষ্কার করে নিচ্ছেন। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে সঙ্গে রাখা ছোট্ট জেনারেটরের সঙ্গে একটি আড়াইশ ওয়াটের বাল্ব সংযুক্ত করলেন তিনি। আর দুটি লাঠি মাটিতে গেড়ে তাতে একটি সাদা রঙের কাপড় টাঙিয়ে দিলেন। এই কাপড়টির পেছনেই আছে বাল্বটি। রাতের গভীরে জামব্রেনার এই আয়োজন মূলত গুবরে পোকা ধরার জন্য। গুবরে পোকা ধরেই সংসারের খরচ চালান তিনি।

আয়োজন শেষ হতে হতেই রাত ৩টা বেজে গেল। রাত আরও গভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন জামব্রেনা। কারণ আকাশে চাঁদ থাকলেও গর্ত থেকে বের হয় না গুবরে পোকা। প্রথমে বেরিয়ে আসে স্ত্রী গুবরেটি। পরে আসে পুরুষটি। এ সময়টির জন্যই অপেক্ষা করেন জামব্রেনা। গর্ত থেকে বের হলেই তিনি দৌড়ে গিয়ে পোকাগুলোকে ধরে ফেলেন। তা না হলে এরা আবার গর্তে মিলিয়ে যায়।

কয়েক ঘণ্টার পরিশ্রমে তিনটি গুবরে পোকা ধরতে সক্ষম হলেন জামব্রেনা। এই পোকাগুলো স্যাতানাস গোত্রের। এ ধরনের বড় চকচকে কালো গুবরে পোকা বলিভিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়। হারকিউলিস গুবরে পোকাদের মতো এই প্রজাতির গুবরে পোকাদেরও শিং রয়েছে। শিংসহ এমন গুবরে পোকারই বিপুল চাহিদা বাজারে। বিশেষ করে জাপানে।

প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত করোইকোর শিকারিরা একেকটি জীবন্ত গুবরে পোকার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। তবে, এই পোকাগুলোই হয়তো জাপানের কোনো পশু-পাখির দোকানে ৫০০ ডলারেও বিক্রি হবে। দাম নির্ভর করে মূলত গুবরে পোকাদের আকার-আকৃতি এবং শিংয়ের দৈর্ঘ্যরে ওপর।

জামব্রেনা সদ্য ধরা গুবরে পোকাগুলোকে খুব সতর্কতার সঙ্গে একটি প্লাস্টিকের কনটেইনারে রেখে দিলেন। এই কনটেইনারটিতে অসংখ্য ছোট ছিদ্র রয়েছে। ভেতরে রাখা পোকাদের অক্সিজেন সরবরাহ এবং সতেজ রাখতেই এই ছিদ্রগুলো করা হয়েছে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে কোনো কোনো দিন তারা সর্বোচ্চ পাঁচটি গুবরে পোকা ধরতে পারেন। প্রতি মৌসুমে একেকজন শিকারি গড়ে ৭০টি করে পোকা ধরেন। জামব্রেনার ধরা সবচেয়ে বড় গুবরে পোকাটি আকারে প্রায় সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা ছিল। তিনি এটিকে এক মেক্সিকানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ওই মেক্সিকানের সঙ্গে জাপানিদের যোগাযোগ ছিল।

বলিভিয়ায় বন্যপ্রাণী ধরা, সংগ্রহ কিংবা মজুদ করা ১৯৯০ সাল থেকেই নিষিদ্ধ। দেশটিতে এই আইন অমান্য করলে একজন ব্যক্তির ছয় বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। বলিভিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় স্যাতানাস গুবরে পোকাদের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী কিংবা উদ্ভিদ পাচারকে খুব কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অন্যদিকে জাপানেও চালু রয়েছে ‘ইনভেসিভ এলিয়েন স্পেসিস অ্যাক্ট’। এই আইনের আওতায় দেশটির বাস্তুসংস্থান, মানুষের নিরাপত্তা, কৃষি, বনায়ন এবং মৎস্যসম্পদের জন্য ক্ষতিকর অন্তত ১৪৮টি প্রাণী ও উদ্ভিদ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে, এই নিষিদ্ধের তালিকায় নেই স্যাতানাস এবং হারকিউলিস প্রজাতির গুবরে পোকা। এ প্রসঙ্গে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আয়া জাতসুমো জানান, জাপানে যেসব প্রাণী ও উদ্ভিদ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেই তালিকায় গুবরে পোকা না থাকার কারণ হলো এই পোকাগুলো জাপানি গুবরে পোকাদের জন্য ক্ষতিকর নয়। তিনি বলেন, ‘এসব গুবরে পোকা অনেক দামি। আর জাপানিরা এগুলো বাড়িতে পোষে, জঙ্গলে ছেড়ে দেয় না।’

বলিভিয়ার করোইকো অঞ্চলের কাছাকাছি সান্তো ডমিঙ্গোর স্যাতানাস গুবরে পোকাশিকারি পরফিরিও মামানি জানান, গুবরে পোকাগুলোকে ধরার পর এগুলোকে জাপান কিংবা বিদেশের অন্যান্য বাজারে পৌঁছাতে নানা বেগ পেতে হয়। এ সময়ের মধ্যে এগুলোকে জীবিত এবং ভালো অবস্থায় রাখা অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ যতেœর অংশ হিসেবে পোকাগুলোকে সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। এগুলোকে প্রতিদিনই গোসল করাতে হয়। কারণ খাদ্য গ্রহণের পর এরা নোংরা হয়ে যায়। কয়েকটি গুবরে পোকাকে একটি কলা খেতে দিলে তারা সারা রাত ধরে এটিকে সাবাড় করে দিতে পারে। মামানি তার ধরা গুবরে পোকাগুলোকে প্রতিবেশী দেশ পেরুর এক দালালের কাছে পাঠান। ওই দালালই পরে পোকাগুলোকে জাপানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ১৯৯৬ সালে গুবরে পোকা শিকার শুরু করার পর এই উপায়ে এখন পর্যন্ত ৭২০টি গুবরে পোকা জাপানে রপ্তানি করেছেন মামানি।

জামব্রেনা জানান, গুবরে পোকা জীবিত রপ্তানি করার অংশ হিসেবে তিনি দুই মাস বয়সী শুককীটও রপ্তানি করেছেন। এই ধরনের শুককীট বিমানবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই পাচার করা সম্ভব।

বলিভিয়ার পতঙ্গবিজ্ঞানী ফার্নান্দো গোয়েরা সিরাডো গুবরে পোকাদের ব্যবসা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিভিন্ন পতঙ্গের অবৈধ কেনাবেচায় অনেক অর্থের লেনদেন হয়। আপনি চাইলে ইন্টারনেটে মাছিও বিক্রি করতে পারবেন। সব পোকারই একটি বাজার রয়েছে। আছে তাদের অসংখ্য ক্রেতা। যদি বিপুল পরিমাণে এই কেনাবেচা চলতেই থাকে, তবে বিশেষ কয়েক প্রজাতির পতঙ্গ শিগগির বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ তার মতে, পাচার ও চোরাকারবার ছাড়াও বন-জঙ্গল উজাড় এবং কৃষিজমির জন্য বনাঞ্চল পুড়িয়ে দেওয়ার ফলে বহু প্রজাতির পতঙ্গ বর্তমানে হুমকির মুখে আছে।

গোয়েরার আরও মনে করেন, বিভিন্ন প্রজাতির গুবরে পোকা এভাবে নিঃশেষ হতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূলে যাবে। কারণ এই পোকাগুলো উষ্ণম-লীয় বনাঞ্চলের পুষ্টি উপাদান ঠিক রাখতে সাহায্য করে। শুককীটদের খাদ্য জোগান দেওয়ার জন্য এরা বিভিন্ন গাছের কাঠ চিড়ে ফেলে। ফলে এই কাঠগুলো মাটির সঙ্গে মিশে উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এমনকি তারা বিভিন্ন জৈব উপাদানের খোঁজে মাটির নিচে প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে মাটিতে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য যা খুবই দরকারি।

জাপানে গুবরে পোকার বাজার

বলিভিয়া থেকে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী দূরত্বে জাপান। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটি দল জাপানের পোষা প্রাণী ব্যবসায়ী ইয়াজোয়ি সুজুকির সঙ্গে কথা বলেন। সুজুকি এবং তার স্বামী হিদায়ুকির ‘ইনসেক্ট শপ গ্লোবাল’ নামে একটি পোষা প্রাণীর দোকান রয়েছে। সুজুকি বলেন, ‘জাপানিরা স্যাতানাস এবং হারকিউলিস প্রজাতির গুবরে পোকার খুব সমাদর করে। কারণ এগুলো জাপানি গুবরে পোকাদের চেয়ে আকারে বড় হয়ে থাকে। বলা যায়, এ ধরনের গুবরে পোকার জন্য জাপানিরা মুখিয়ে থাকে।’

জানা যায়, প্রতি বছর গ্রীষ্মে জাপানি শিশুরা বিভিন্ন পার্ক এবং সবুজ আচ্ছাদিত জমিগুলোতে গুবরে পোকার সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। এমন আসক্তি থেকেই পোকেমন সিরিজের মেগা-হেরাক্রস চরিত্রটি হারকিউলিস গুবরে পোকার আদলেই বানানো হয়েছে।

সুজুকি জানান, জাপানি গুবরে পোকাগুলোর আয়ু খুব কম হয়। বড়জোর এরা তিন মাসের মতো বেঁচে থাকতে পারে। সেই তুলনায় হারকিউলিস ও স্যাতানাস গুবরে পোকাদের আয়ু অনেক বেশি। এরা অন্তত দুই বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম।

জাপানে সাধারণত দুই ধরনের গুবরে পোকাপ্রেমী রয়েছে। এর মধ্যে এক দল গুবরে পোকাদের পোষে বড় করে এবং জীবিত রাখে। আরেক দল আছে যারা বিভিন্ন ধরনের গুবরে পোকা সংগ্রহ করেন সাজিয়ে রাখার জন্য। সুজুকি অবশ্য জীবিত গুবরে পোকার ব্যবসা করেন। তার দোকানেই অসংখ্য গুবরে পোকা পরিপুষ্ট হয়ে বেড়ে ওঠে। জাপানি প্রজননকারীদের কাছ থেকেও তিনি গুবরে পোকার শুককীট সংগ্রহ করে এগুলোকে বড় করেন। সুজুকির দোকানে চোখ রাখলেই দেখা যায়, সেখানে বেশ কিছু কনটেইনার রয়েছে, যেগুলোর অর্ধেক পর্যন্ত মাটি দিয়ে পূর্ণ করা। এগুলো মূলত গুবরে পোকাদের আবাসস্থল। এদের জন্য প্রাণীজ উপাদানসমৃদ্ধ অত্যন্ত উপাদেয় একটি খাবার তৈরি করেন সুজুকি। জেলির মতো এই খাবারটিতে গুবরে পোকাদের প্রয়োজনীয় সব উপাদানই রয়েছে।

সুজুকি জানান, এর আগে তার স্বামী হিদায়ুকি অন্তত তিনবার মেক্সিকোর বাজা ক্যালিফোর্নিয়া উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গোয়াদালোপ দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করেছেন। আর এই ভ্রমণের কারণ ছিল হারকিউলিস প্রজাতির গুবরে পোকা সংগ্রহ করা। এ ছাড়া ১০ বছর আগে সুজুকি এবং তার স্বামী বলিভিয়াতেও গিয়েছিলেন। তারা সেখান থেকে ২০০ স্যাতানাস গুবরে পোকা নিয়ে দেশে ফিরতে চাইলে বলিভিয়া কর্তৃপক্ষ পোকাগুলোকে আটকে দেয়।

গুবরে পোকার লড়াই

পেরুর লিমায় অবস্থিত ফেডেরিকো ভিলারিয়েল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইন্নাকোন ওলিভার ও আলেক্সান্ডার সোরাস গুবরে পোকাদের বিলুপ্তির পথে হাঁটার জন্য এই পতঙ্গটির লড়াইয়ের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টকে দায়ী করেছেন। এ কারণেই মূলত বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

জাপানিরা শিংযুক্ত সুসজ্জিত গুবরে পোকাদের বাড়িতে পুষতে খুব ভালোবাসে। বনের মধ্যে মুক্ত অবস্থায় শিংযুক্ত গুবরে পোকারা তাদের শিংগুলোকে কোনো কিছু তুলতে, পথ পরিষ্কার করতে ও আঘাত করতে ব্যবহার করে। এ ছাড়া মিলনের মৌসুমগুলোতে পুরুষ গুবরে পোকারা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য।

ইউটিউবে জাপানি বিভিন্ন চ্যানেলে প্রায় সময়ই দেখা যায়, ছোট্ট একটি রেসলিং রিংয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে দুই গুবরে পোকা। নিজেদের শিং ব্যবহার করে এগুলো একে অপরকে অনবরত আঘাত করার চেষ্টা করে এবং এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হলো একটি পোকা অন্য পোকাটিকে রিং থেকে বের করে দেয়। এ ধরনের লড়াইয়ের লাখ লাখ দর্শক রয়েছে।

জাপানে একটি পতঙ্গ দোকানের ম্যানেজার কাজুহিকো ইজিমা জানান, টোকিওতে পোকাদের লড়াইয়ের অসংখ্য টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। শুধু তাই নয়, এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরা বিপুল অঙ্কের অর্থও জিতে। গুবরে পোকার রেসলিংগুলো সাধারণত গ্রীষ্মকালে অনুষ্ঠিত হয়। তাই গ্রীষ্মকালকে সামনে রেখে জাপানিরা তাদের বাড়িতে পোষা গুবরে পোকাদের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে। অনেকেই লড়াইয়ের জন্য মনোনীত গুবরে পোকাটিকে তুলনামূলক ছোট আকারের গুবরে পোকার সঙ্গে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ দেয়। এতে লড়াইয়ে জয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে ওই গুবরে পোকাটির।

বয়স্কদের পাশাপাশি জাপানি শিশু-কিশোরদের মধ্যেও গুবরে পোকা পোষা এবং লড়াইয়ে নামানোর ব্যাপক ঝোঁক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তেশো সুজুকির নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই ৮ বছরের এই শিশু জাপানের হনসু দ্বীপে ইয়ামাগাটা প্রিফেকচারে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল বিটল সুমো টুর্নামেন্ট’-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ওই প্রতিযোগিতায় তোশোর মতো আরও চার শতাধিক শিশু তাদের পোষা লড়াকু গুবরে পোকাদের নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল।

জাপানে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় বাজি খেলারও প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে ওকিনাওয়ার রিয়ুকিয়ু দ্বীপপুঞ্জে এই বাজি খেলার হার সবচেয়ে বেশি হয়। যদিও জাপানের অপরাধ আইন অনুসারে এই ধরনের বাজি খেলায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন সাইটে বিটকয়েন ব্যবহার করে দেশটিতে বাজি খেলার হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে গুবরে পোকাদের লড়াইয়ে বাজি ধরা ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গুবরে পোকা চোর ধরতে

পতঙ্গ বিশারদ ফার্নান্দো গুয়েরা বলেন, জাপানের গুবরে পোকা চোরাকারবারির বর্তমানে বলিভিয়ার সরবরাহকারীদের পাশ কাটিয়ে নিজেরাই দেশটিতে ভ্রমণ করছে এবং বিপুল পরিমাণ পোকা পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে। একই সুর পাওয়া গেল করোইকোর গুবরে পোকা শিকারি রেইনাল্ডো জামব্রেনার কণ্ঠেও। তিনি জানান, কিছু কিছু জাপানি ইংরেজি বলতে পারা ভ্রমণ গাইডদের ভাড়া করে, যারা তাদের গুবরে পোকা ধরার জন্য বিভিন্ন সাইটে নিয়ে যায়।

করোইকোর এমন একজন ট্যুর গাইড নাম প্রকাশ না করার শর্তে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে জানান, ২০১৮ সালে তিনজন জাপানি তাকে ভাড়া করেছিলেন স্যাতানাস গুবরে পোকাদের খুঁজে বের করার জন্য। পরে তারা করোইকোর আরাপাতা নামে একটি এলাকায় তাঁবু ফেলেছিলেন। সেখান থেকে তারা তিনটি পোকা সংগ্রহ করেছিলেন এবং ওই এলাকাটিতে আবার কোনো একসময় পোকা শিকারের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

গুবরে পোকা শিকার এবং পাচারের জন্য বলিভিয়ায় গ্রেপ্তারের ঘটনা নেই বললেই চলে। দেশটির গুবরে পোকা পাচারকারীরা পেরুভিয়ান সীমান্ত অঞ্চলকে ব্যবহার করে। কারণ এই সীমান্তের কিছু কিছু অঞ্চলে সীমান্তরক্ষীদের নজরদারি খুব কম। বলিভিয়ার সঙ্গে পেরুর একশ মাইলেরও বেশি সীমান্ত সংযোগ রয়েছে।

২০০৭ সালে হসোগুশি মাসাৎসুগো নামে এক জাপানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ইকুয়েডরের কিটোতে অবস্থিত ম্যারিস্কেল সুক্রে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কারণ সেবার তিনি অন্তত ৪২৩টি গুবরে পোকা নিয়ে জাপানের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। পরে সেখান থেকে ২১১টি স্যাতানাস প্রজাতির গুবরে পোকা বলিভিয়াকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ইকুয়েডর কর্র্তৃপক্ষ।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলিভিয়ার লা পাজে গ-ারের মতো শিংযুক্তসহ বিভিন্ন প্রজাতির অন্তত ২ হাজার ৭৫২টি গুবরে পোকা পার্সেল বন্দি অবস্থায় আটক করা হয়। এ ঘটনার সূত্র ধরে এরিকা কুয়েভাস স্যান্তোস নামে এক বলিভিয়ান নারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে জেলে ঢোকানো হয়। তবে, তিনি পেরুতে যে নারীর কাছে এই পোকাগুলোকে পাঠাচ্ছিলেন সেই দিনা এলসা ভেগা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছে।

বলিভিয়া থেকে যে হারে গুবরে পোকা পাচার করা হয়, সেই তুলনায় নথিভুক্ত এসব গ্রেপ্তারের সংখ্যা নেহাতই কম। জানা গেছে, বর্তমানে পতঙ্গ চোরাকারবারিরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করছে। পাচারকারীরা তাদের ৮০ ভাগ অর্ডারই এখন অনলাইনে পেয়ে থাকেন। ফলে তাদের ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এখন কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বলিভিয়ার সরকার অবশ্য বিকল্প পথে হাঁটছে। তারা বরং শিশুদের পরিবেশ-সংক্রান্ত শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটির ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। আশা করা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মই দেশটির গুবরে পোকা পাচার ঠেকিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশের এই পতঙ্গটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন গুবরে শিকারি জামব্রেনাও। শিগগির এই পেশা থেকে বিদায় নিয়ে অন্য কিছু করার চিন্তাভাবনা করছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর তিনি অনুধাবন করছেন প্রতিনিয়ত শিকারে বলিভিয়ার বনজঙ্গল থেকে গুবরে পোকাদের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। শিগগির হয়তো এর বিরূপ প্রভাব দেখা দেবে।