নির্বাচনে প্রার্থী হতে বিএনপি নেতাদের অনীহা

দলীয়ভাবে যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত থাকলেও নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিএনপি নেতারা। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলেন বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি বলেন, ভোটাররা যে কারণে ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। একই কারণে বিএনপির নেতারাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

দলের নেতাদের অনাগ্রহের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নামে সরকার যা করেছে তারপর আর বিএনপি নেতারা কী করে আগ্রহ দেখান।

তিনি বলেন, জনগণ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। একই কারণে বিএনপি নেতারাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। বিএনপি এসব নির্বাচনে যাচ্ছে শুধু গণতন্ত্রের স্বার্থে। গণতন্ত্রের স্বার্থে  নির্বাচনে গেলেও সরকার কোনো ছাড় দেয় না। 

গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। অন্যদিকে দক্ষিণের জন্য মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন বিএনপির পররাষ্ট্র উইংয়ের সদস্য প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। যদিও অন্যান্য সময়ে একাধিক নেতা সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি কার্যালয় নসিমন ভবনে মহানগর ও জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি বলেন, যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত তাদের দলের রয়েছে।

সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহে দলের নেতাদের অনীহার বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৯ ডিসেম্বর রাতেই ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে যায়। ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে একতরফা নির্বাচন করেছে সরকার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টদের কেন্দ্রে থাকতে দেওয়া হয়নি। বিএনপির ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে না যান তার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

তিনি বলেন, যে কারণে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যান না সে কারণেই বিএনপির নেতারা ভোট করতে চান না। কারণ নির্বাচনে প্রার্থী হলে একজন প্রার্থীকে যে পরিমাণ মানসিক চাপ নিতে হয় তা কেউ নিতে চান না। শুধু তাই নয়, প্রার্থীর পক্ষে যারা কাজ করেন তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রার্থীকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাছাড়া যারা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন তাদের শুধু শুধু মিথ্যা কথা বলতে হয়। এর  চেয়ে সরকার আইন করে নির্বাচনের নামে প্রহসন বন্ধ করতে পারে। এতে দেশের টাকার অপচয় হবে না। ভোটারদের কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে না। 

আজ রবিবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। চসিক নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও চট্টগ্রাম বিএনপি নেতাদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। চসিক নির্বাচনে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আবু হাশেম বক্কর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. এরশাদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার নাম শোনা গেলেও তিনি অতটা আগ্রহী নন। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবেন। তবে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করবেন না। কারণ এখন যে নির্বাচন হয় সে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। কারণ নির্বাচনের ফল কী হবে তা সবাই জানেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিজয়ী হবেন। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া মানেই বিজয়ী হওয়া।

মো. এরশাদ উল্লাহ বলেন, এর আগে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন এম এ মঞ্জুর। সে সময় বিএনপির আরও বেশ কয়েকজন নেতা মেয়র পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। 

বিএনপির দপ্তর সংশ্লিষ্ট নেতারা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা-১০, বাগেরহাট-৪ ও গাইবান্ধা-৩ আসনের উপনির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ৭ নেতা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে একমাত্র প্রার্থী শেখ রবিউল ইসলাম রবি, বাগেরহাট-৪ আসনে কাজী মনিরুজ্জামান, মনিরুল হক ও কাজী খায়রুজ্জামান শিপন এবং গাইবান্ধা-৩ আসনে মাইনুল হাসান সাদিক, রফিকুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান সরকার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

তারা বলেন, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসনে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম এ মান্নান। কিন্তু বর্তমানে তিনি অসুস্থ থাকায় নির্বাচনে লড়াই করবেন না। তার মেয়ের জামাই এবং বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। ফলে ঢাকা-১০ আসনে একমাত্র প্রার্থী রবিউল ইসলাম রবি।

দপ্তর সংশ্লিষ্ট নেতারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী-পাঁচলাইশ-চান্দগাঁও) উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ১৩ জানুয়ারি। ঐ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন মাত্র দুজন। এতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. এরশাদ উল্লাহ। মাত্র দুজন মনোনয়ন চেয়েছিলেন ঐ নির্বাচনে। 

গত ৬ ফেব্রুয়ারি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক বৈঠক শেষে ইসি’র জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো চসিকে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে।