খেলাপি ঋণ ও ‘ছয়-নয়’ সুদহারে বিপর্যস্ত হতে যাওয়া ব্যাংক খাতের প্রতি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ করেই আগ্রহ বেড়েছে। মুনাফা সংকটে থাকা এ খাত গত দুই বছর টানা দর হারিয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। মূল্য আয় অনুপাতও (পিই রেশিও) সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। দর ও পিই রেশিওর এ অবস্থানই খাতটিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের মূল কারণ। গতকাল রবিবার ব্যাংক খাতের সব কোম্পানির শেয়ারদর গড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। এটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচকের (ডিএসইএক্স) উল্লম্ফনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে।
গতকাল দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি অন্য খাতগুলোর বাজার মূলধনও বেড়েছে। এদিন ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৮২ শতাংশ শেয়ারের দর বেড়েছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি বেড়েছে ১৬৯ পয়েন্ট। গত ১৯ জানুয়ারির পর এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় উত্থান। এদিন সূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণও বেড়েছে। ডিএসইতে গতকাল লেনদেন হয়েছে ৯১৬ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। দেশের অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ৮০ শতাংশ সিকিউরিটিজের দর বৃদ্ধিতে নির্বাচিত খাতগুলোর সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তবে আগের দিনের চেয়ে লেনদেন ৫৯ শতাংশ কমেছে।
১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিল গঠনের পর থেকেই স্টক এক্সচেঞ্জ দুটির সূচক ও লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ সময়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৩৪০ কোটি থেকে বেড়ে ৯১৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকে ৩৪৮ যোগ হয়ে ৪৭৩৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ তহবিল গঠনের পর গতকালই সবচেয়ে বেশি সূচক বেড়েছে। আর এই সূচক বাড়াতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে ব্যাংক খাত। ডিএসইর বাজার মূলধনের শীর্ষে রয়েছে খাতটি। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের ফ্রি-ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ারের সংখ্যা বেশি। মূলত ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে সূচক গণনা করা হয়। যেহেতু ব্যাংক খাতের বাজার মূলধন ও ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের সংখ্যা বেশি, এ খাতটির দর বাড়া বা কমা সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
এদিকে ছয়-নয় সুদহারকে কেন্দ্র করে আগামীতে ব্যাংক খাতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। ব্যাংক খাতে সুদহার বেঁধে দেওয়ায় দেশের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে ফিচ রেটিং এজেন্সি সতর্ক করেছে। দেশের ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরাও মনে করছেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সর্বোচ্চ সুদহার কার্যকর হলে খাতটির মুনাফা কমে যেতে পারে। তখন তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এসএমই ও শিল্প খাতে ঋণের প্রবাহ আরও কমে যেতে পারে।
ডিএসইর খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল সব খাতের শেয়ারের দর বাড়ায় এক দিনে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বাজার মূলধন বেড়েছে ব্যাংক খাতের। দর বৃদ্ধিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাত। গতকাল এ খাতটির দর বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বস্ত্র, প্রকৌশল, সেবা ও নির্মাণ খাতের দর বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিক, এনবিএফআই, বিবিধ ও খাদ্য খাতের বাজার মূলধনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
গতকাল সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়েছে প্রকৌশল খাতে। ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৬ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এ ছাড়া বস্ত্র, ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। একক কোম্পানি হিসেবে গতকাল ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের। এই কোম্পানির ৩২ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। ২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার লেনদেনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি। এ ছাড়া বাংলাদেশ সাবমেরিন কোম্পানি, বাংলাদেশ শিপিং কোম্পানি, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, সামিট পাওয়ার ও এসএস স্টিলের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কেনাবেচা হয়েছে।
ডিএসইতে দর বৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় রয়েছে ওরিয়ন ইনফিউশনস, স্যালভো কেমিক্যাল, এসিআই ফর্মুলা, সায়হাম টেক্সটাইল, ওরিয়ন ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেড, আফতাব অটো ও ব্র্যাক ব্যাংক। বিপরীতে দর হারানোয় শীর্ষ তালিকায় অলটেক্স, মেঘনা পিইটি, তুংহাই টেক্সটাইল ও সাভার রিফ্র্যাক্টরিজের মতো দুর্বল ও জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি।