করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চীনের উহানসহ বিভিন্ন প্রদেশে আটকে পড়া আরও ১৭১ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। গতকাল রবিবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, চীনে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের অন্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ সময় তিনি বাংলাদেশিদের আরও কিছুদিন চীনে অবস্থান করার পর দেশে ফেরার পরামর্শ দেন।
সে ক্ষেত্রে চীনের বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ থেকে বিমান না পাঠিয়ে চীন থেকে বিমান ভাড়া করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনে বাইরের কোনো বিমান ঢুকতে পারছে না। সেখানকার বিমান ভাড়া করার চেষ্টা চলছে। ফিরতে ইচ্ছুকদের নাম নিবন্ধন করছে চীনের বাংলাদেশ দূতাবাস। তবে ঠিক কবে নাগাদ এসব বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হবে, সে ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি ৩১২ বাংলাদেশিকে চীনের উহান থেকে ফিরিয়ে আনে সরকার। তখন যে বিমানে করে আনা হয়েছে পরে ওই বিমানের পাইলট-ক্রুদের অন্য দেশে ঢোকার ব্যাপারে আপত্তি এসেছে। এমনকি বর্তমানে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অন্য কোনো পাইলটকে আর চীনে পাঠানোর ঝুঁকি নিতে পারছে না বাংলাদেশ। পরে চীনে অন্য দেশের বিমানঢোকার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করে চীন। এমন প্রেক্ষাপটে উহানসহ বিভিন্ন প্রদেশে আটকে থাকা ১৭১ জন বাংলাদেশি ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করলে সরকারের পক্ষ থেকে ‘আর কাউকে ফিরিয়ে আনা হবে না’ বলে জানায় সরকার। এর কিছুদিন পর অবশ্য ‘নিজ খরচে’ ফিরতে হবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
চীনের জন্য মাস্কসহ স্বাস্থ্যসামগ্রী পাঠাল বাংলাদেশ : এদিকে করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত চীনের জন্য মাস্ক, গাউন, ক্যাপ, হ্যান্ড গ্লোভ ও স্যানিটাইজারসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘সহমর্মিতামূলক সহায়তা’ হিসেবে দেশটির জন্য এসব সামগ্রী পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণহানির ঘটনায় শোক ও সমবেদনা জানিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের হাতে ওই চিঠি ও স্বাস্থ্যসামগ্রী হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।
চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাসে আক্রমণে স্বজন হারানো চীনা পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। চীন সরকার কর্র্তৃক দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সঠিকভাবে সেবা প্রদানেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। চীন দ্রুত সময়ের মধ্যে এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। পাশাপাশি চিঠিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে নিমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাড়ি ফেরা সবাই ১০ দিন হোম কোয়ারেন্টাইন : উহান থেকে দেশে ফেরা ৩১২ জন দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ শেষে বাড়ি ফিরে গেলেও আরও ১০ দিন তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। পাশাপাশি এসব বাংলাদেশিকে ১১ নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ৩১২ জনের সবাই সুস্থ আছেন। কোয়ারেন্টাইন শেষ করা কারও মধ্যে করোনাভাইরাসের লক্ষণ বা উপসর্গ ছিল না। তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস নেই, এ রকম ছাড়পত্র দেওয়ার পর সবাই বাড়ি ফিরে গেছেন।
তারপরও ‘অতিরিক্ত সতর্কতা’ হিসেবে তাদের আরও ১০ দিন নজরে রাখা হবে জানিয়ে অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, তারা যেন জনসমাগম এড়িয়ে চলেন। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তারা যেন বাড়িতে অবস্থান করেন। বাড়ির বাইরে গেলেও মাস্ক ব্যবহার করবেন।
‘অতিরিক্ত সতকর্তা’ হিসেবে তাদের ‘কন্ডিশনাল রিলিজ’ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে আইইডিসিআর পরিচালক জানান, ১০ দিনের মধ্যে তাদের শরীরে কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে আইইডিসিআরকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হবে। সে জন্য তাদের যোগাযোগের ফোন নম্বর, ঠিকানাসহ সব তথ্য রেখে দিয়েছে আইইডিসিআর। তারা যে যেখানে থাকবেন, সেখানকার সিভিল সার্জন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করা হবে। আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগের সব নম্বরও তাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক ফ্লোরা।
সব মিলিয়ে ২৪ দিন নজরদারির কারণ ব্যাখা করে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডকুমেন্টে লেখা আছে সর্বোচ্চ ১৪ দিন। ১৪ দিন তারা চীনে অবস্থান করেছেন। তাদের মধ্যে কোনো উপসর্গ ছিল না। বাকি ১০ দিন আমরা অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তাদের নেটওয়ার্কের মধ্যে রেখেছি।
১ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ বিমানে করে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে উহান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে ৩০১ জনকে আশকোনার হজক্যাম্পে ‘কোয়ারেন্টাইনে’ রাখা হয়। বাকি ১১ জনকে রাখা হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। দুই সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ শেষে গত শনিবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তাদের সবাইকে স্বাজনদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে শনি ও রবিবার তারা বাড়ি ফেরেন।
১১ নির্দেশনা : আশকোনা হজক্যাম্প থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়া চীনফেরত বাংলাদেশিদের জন্য ১১ নির্দেশনা দিয়েছে আইইডিসিআর। এগুলো হলো কোয়ারেন্টাইন থেকে বাসায় যাওয়ার পথে গাড়িতে মাস্ক পরবেন। যে যানবাহনে (বাস/ ট্রেন/ লঞ্চ/ বিমান) করে বাড়ি যাবেন তার নাম, নম্বর, যাত্রার সময় আইইডিসিআরকে জানাবেন, যে বাসায় অবস্থান করবেন, খুব জরুরি না হলে সে বাসা বদল করবেন না, যথাসম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলবেন, বাসার বাইরে যাওয়া অত্যাবশ্যক হলে নাক-মুখ ঢাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করবেন, নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ধুবেন (অন্তত ২০ সেকেন্ড), অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না, কাশি শিষ্টাচার মেনে চলবেন (হাঁচি বা কাশির সময় বাহু বা টিস্যু বা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে), অসুস্থ পশু-পাখির সংস্পর্শ পরিহার, মাছ-মাংস-ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া, শারীরিক অসুস্থতা (জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি) দেখা দিলে আইইডিসিআর হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করা এবং পরবর্তী করণীয় জেনে নেওয়া, মৃদু অসুস্থতার ক্ষেত্রে নিজ ঘরে অবস্থান করা ও নাক-মুখ ঢাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নির্দিষ্ট একজন রোগীর সেবা করবেন, তিনি মাস্ক ব্যবহার করবেন ও প্রতিবার রোগীর সংস্পর্শে আসার পর মাস্কটি ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলবেন এবং সাবান-পানি দিয়ে দুই হাত ধুয়ে ফেলবেন।