দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কালো তালিকাভুক্ত ১৬ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠাকে কোনো ধরনের কাজ না দিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির জন্য কুখ্যাতি লাভ করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরখাস্ত হওয়া তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমেরই দুটি প্রতিষ্ঠান। যে দম্পতি দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।
দুদক থেকে পাওয়া নথিপত্রে ঘেঁটে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তরগুলোতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো কাজ না দেওয়ার জন্য সম্প্রতি দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলওয়ার বখ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর চিঠি দেন। ওই চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় তাদের অধীন অধিদপ্তর ও দপ্তরগুলোকে দুদকের কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম-ঠিকানা ও অপরাধের বিবরণ উল্লেখসহ সতর্ক করে চিঠি দেয়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে।
দুদকের কালো তালিকাভুক্ত ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছেÑ রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রূপা ফ্যাশন, মেসার্স অনিক ট্রেডার্স, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ম্যানিলা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স এস কে ট্রেডার্স, এমএইচ ফার্মা, মেসার্স অভি ড্রাগস, মেসার্স আলবিরা ফার্মেসি, এসএম ট্রেডার্স, মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি, ইউনির্ভাসেল ট্রেড করপোরেশন, এএসএল, ব্লেয়ার এভিয়েশন ও ভেনিভোলেন্ট এন্টারপ্রাইজ।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর দুদক সচিবের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, প্রতিষ্ঠানের এমএসআর, ভারী মেশিনারিজ ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন না থাকলেও প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে এমএসআর, ভারী যন্ত্রপাতি, সেবা ইত্যাদি ক্রয় করে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ না করেই বিল পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রে অসাধু ঠিকাদাররা জোট বেঁধে (সিন্ডিকেট) এ ধরনের দরপত্রে অংশ নেয়। যার কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারদর না পাওয়ায় প্রচলিত বাজারদরের কয়েকগুণ বেশি দামে পণ্যসামগ্রী কেনা হয়। এতে সরকারের বিপুল অর্থ ক্ষতিসাধনসহ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, দুদক দীর্ঘ অনুসন্ধান করে মামলা ও মামলার সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করেছে। দুদক এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা প্রয়োজন মনে করে।
দুদকের কালো তালিকাভুক্ত ১৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি হচ্ছে দুর্নীতির জন্য কুখ্যাতি পাওয়া আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমের রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত ঢাকার এক মামলায় ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানার মামলা সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা সরকারি তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
পুরানা পল্টনের আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবীবের মালিকানাধীন মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, তোপখানা রোডের জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আসাদুর রহমানের মালিকানাধীন ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের বিরুদ্ধে দুদকের খুলনার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের মামলায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৬ কোটি ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যালের বিরুদ্ধে রংপুর মেডিকেল কলেজের সাড়ে ৪ কোটি টাকা ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুদক। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে মিরপুরের মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ ও বনানীর আফতাব আহমেদের এএসএলকে কালো তালিকাভুক্ত করে দুদক।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে ১০ কোটি আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার মিরপুরের আবদুল্লাহ আল মামুনের মালিকানাধীন অনিক ট্রেডার্স ও মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের নাম উঠেছে দুদকের কালো তালিকায়। এছাড়া বিনা টেন্ডারে সাড়ে ৯ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের অভিযোগে রংপুরের মনজুর আহমেদের মালিকানাধীন মেসার্স ম্যানিলা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স এস কে ট্রেডার্স, মোসাদ্দেক হোসেনের মালিকানাধীন এমএইচ ফার্মা, জয়নাল আবেদীনের মালিকানাধীন মেসার্স অভি ড্রাগস, আলমগীর হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স আলবিরা ফার্মেসি ও মো. মিন্টুর মালিকানাধীন এসএম ট্রেডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। কালো তালিকাভুক্ত ঢাকার মোকছেদুল ইসলামের মালিকানাধীন ব্লেয়ার এভিয়েশনের নামে ৭৫ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি ও মিথ্যা ব্যয় দেখিয়ে ৮৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দিনাজপুরে মামলা রয়েছে। ঢাকার আরেক প্রতিষ্ঠান শাহীনুর রহমানের মালিকানাধীন মেসার্স ভেনিভোলেন্ট এন্টারপ্রাইজকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সাতক্ষীরায় ৪৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকায়।
এ সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বেলাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর কাছে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানাসহ পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান যাতে কোনোভাবেই দরপত্র বা ঠিকাদারি কাজে অংশ নিতে পারে সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুই মামলা অনুমোদন : সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জনসহ দুজনের বিরুদ্ধে ৪১ লাখ ৪২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গতকাল সোমবার দুটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। মামলার যাদের আসামি করা হচ্ছে তারা হলেনÑ সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ও সাতক্ষীরা ম্যাটসের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. তওহীদুর রহমান ও ঢাকার ভেনিভোলেন্ট এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহীনুর রহমান। এজাহারে বলা হয়, আসামিরা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) জন্য নিম্নমানের খেলাধুলার সামগ্রী উচ্চমূল্যে ক্রয় দেখিয়ে ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) ২০ লাখ ৬১ হাজার আত্মসাৎ করেছেন।