দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণ বা রেডিয়েশনের মাত্রা জরিপ করে মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থাটি বলছে, টাওয়ারের রেডিয়েশন আন্তর্জাতিক ও বিটিআরসির বেঁধে দেওয়া মানদণ্ডের অনেক নিচে আছে। তাই এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। গতকাল সোমবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘টাওয়ার রেডিয়েশনের মানদণ্ড ও সাম্প্রতিক জরিপ’ শীর্ষক এক আলোচনায় বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মো. আমিনুল হাসান এসব তথ্য জানান।
গত বছর এপ্রিলে ঘরবাড়ির ছাদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, উপাসনালয়, জেলখানা, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল টাওয়ারের নিঃসৃত বিকিরণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করছে কি না তা খতিয়ে দেখতে সমীক্ষা করার আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে বিটিআরসিকে চার মাসের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় তার থেকে কী পরিমাণ বিকিরণ শরীর গ্রহণ করছে (স্পেসিফিক অ্যাবসরপশন রেট বা এসএআর মান) তা নির্ণয় করে প্রতিবেদন দিতে বলে আদালত।
দেশের অনেক স্থানে মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন জরিপ করা হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে জানিয়ে বিটিআরসির কমিশনার আমিনুল হাসান বলেন, ‘টাওয়ারের রেডিয়েশনের ফল অত্যন্ত সন্তোষজনক পাওয়া গেছে যা আমরা নিয়মিতভাবে বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করি। আপনি যদি ভবিষ্যতে আরও উন্নততর সেবা পেতে চান তাহলে আরও বেশি মোবাইল সাইট স্থাপনের বিকল্প নেই। টাওয়ার রেডিয়েশন নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তি আছে, এটা ভিত্তিহীন। আমরা সরকারি, বেসরকারি সংস্থা বা ভবনমালিকদের নিশ্চিত করছি যে আপনারা ভয় পাবেন না।’
বিটিআরসির হিসাবে দেশে সব মোবাইল অপারেটরের প্রায় ৩৩ হাজার টাওয়ার রয়েছে। মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব মহাসচিব এসএম ফরহাদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মোবাইল শিল্প খাতের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের উপপরিচালক শামসুজ্জোহা বলেন, ‘রেডিয়েশন দুই প্রকার আয়োনাইজিং ও নন-আয়োনাইজিং। এর মধ্যে আয়োনাইজিং রেডিয়েশন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর যেমন পারমাণবিক বর্জ্য, সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রে, গামা-রে কিংবা এক্স-রে। এগুলো শরীরের মধ্যে ডিএনএ পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’
মোবাইল রেডিয়েশন নন-আয়োনাইজিং উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর শক্তি খুব কম। ফলে এর কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। মোবাইল টাওয়ারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ইএমএফ রেডিয়েশন বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে এবং আমরা জরিপে পেয়েছি যে দেশের মোবাইল টাওয়ারগুলোর রেডিয়েশন নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে আছে। আমরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সুন্দরবন, ফেনী, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, জামালপুর ইত্যাদি অনেক এলাকায় জরিপ চালিয়েছি এবং এ পর্যন্ত কোথাও নির্ধারিত সীমার বেশি রেডিয়েশন পাইনি।’
বুয়েটের অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেন, ‘বিটিআরসি সারা দেশে মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন নিয়ে জরিপ করছে এবং দেশে রেডিয়েশনের লেভেল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে আছে, এটা খুবই সন্তোষজনক ব্যাপার। টাওয়ার নিয়ে যে বিভ্রান্তি আছে তা দূর হওয়া দরকার। কারণ আমাদের প্রযুক্তি নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। এটা নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
অ্যামটব মহাসিচব এসএম ফরহাদ বলেন, ‘সামনে যখন ফাইভ-জি আসবে তখন আমাদের অনেক বেশি সাইটের প্রয়োজন হবে। তাই শুধু শুধু আতঙ্কিত হয়ে প্রযুক্তিকে রুদ্ধ করার কোনো যুক্তি নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক শুধু অনুমানের ভিত্তিতে ছড়ানো হচ্ছে যে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন মানুষ বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এটা একেবারেই সত্য নয়।’
বিটিআরসির উদ্যোগে ও অ্যামটবের আয়োজনে এ আলোচনায় আরও অংশ নেন স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম শহিদুল আলম, হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের (বাংলাদেশ) মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক এসএম নাজমুল হাসান।