সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দিনের লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। এরপর টানা দরপতনে স্টক এক্সচেঞ্জটির লেনদেন নেমে আসে ২০০ কোটি টাকার ঘরে। এর এক বছর পর ডিএসইর লেনদেন আবারও হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল গঠনের পর থেকে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় ধারাবাহিকভাবে লেনদেন বাড়ছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ২১ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ। এর আগে সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ডিএসইতে কেনাবেচা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল।
এদিকে লেনদেনে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলেও গতকাল বেশিরভাগ শেয়ারের দরহ্রাসে মূল্যসূচক নি¤œমুখী অবস্থানে ফিরেছে। মূলত ব্যাংকসহ বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি ও এক অঙ্কের সুদহারকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা চলছে ব্যাংক খাতে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে সব ধরনের ঋণে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর হবে। এর ফলে ব্যাংক খাতের মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়তে পারে। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফ্রি- ফ্লোট শেয়ার রয়েছে ব্যাংক খাতের। শীষ মূলধনী খাত হওয়ায় ব্যাংকের শেয়ার দরের ওঠানামা সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে উৎপাদনশীল খাতও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারে।
তবে এসব বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও গত এক সপ্তাহ ধরেই পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে তিনগুণ। মূলত গত ১ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল গঠনের পর থেকেই সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠায় লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। এ সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও কেনাবেচায় অংশগ্রহণ বাড়িয়েছেন। পুঁজিবাজারে মন্দার সময় লেনদেনের ৬ শতাংশেরও কম ছিল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, যা বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে তহবিল গঠনে প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ট্রেজারি বিল বা বন্ড রেপোর মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ গণনার হিসাব থেকেও বাইরে রাখা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল গঠনের পর থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছে। গতকালও শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে কেনাবেচার পরিমাণ বাড়তে দেখা গেছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজ লংকাবাংলা সিকিউরিটিজে মোট লেনদেন ছিল প্রায় ৩২ কোটি টাকা, যা গতকাল ১৩০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ সময় ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের লেনদেন ৩৫ কোটি থেকে ৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের লেনদেন ১৮ কোটি থেকে ৬০ কোটি টাকায়, আইডিএলসি সিকিউরিটিজ ৩০ কোটি থেকে ৬৬ কোটি টাকায়, ইবিএল সিকিউরিটিজ ২৪ কোটি থেকে ৫৯ কোটি টাকায় ও ইউনাইটেড ফিনান্সিয়াল ট্রেডিংয়ের লেনদেন ১৯ কোটি থেকে ৪৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সিটি ব্রোকারেজ, ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজ, এমটিবি সিকিউরিটিজসহ প্রায় সব ব্রোকারেজ হাউজেই কেনাবেচা বেড়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশই এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এছাড়া সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হওয়ার কারণেও লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে।
তবে লেনদেন বাড়লেও গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া বড় মূলধনীসহ ৫২ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি কমেছে ২৭ পয়েন্ট। টানা পাঁচ কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী ধারার পর গতকাল মূল্যসূচক কিছুটা কমল। মূলত ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের সংবাদ ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ায় মূল্যসূচক কমেছে। এর আগে টানা পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৩৮৩ পয়েন্ট বাড়ে। সূচক কমাতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, এনবিএফআই, বীমা, সিমেন্ট ও জ¦ালানি খাত। গতকাল এসব খাত ২ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাজার মূলধন হারিয়েছে। বিপরীতে টেলিযোগাযোগ ও প্রকৌশল খাতে সামান্য দর বেড়েছে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনকৃত কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩২টির, কমেছে ১৮৮টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৫টির। গতকাল ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষে থাকা বেশিরভাগ সিকিউরিটিজই মিউচুয়াল ফান্ড।
গতকাল লেনদেনের ভিত্তিতে (টাকায়) প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো সামিট পাওয়ার, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, খুলনা পাওয়ার, ওরিয়ন ফার্মা, ন্যাশনাল টিউবস, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্রামীণফোন, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, গোল্ডেন হারভেস্ট ও ইন্দো-বাংলা ফার্মা।