নিরীক্ষা আপত্তির সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে গ্রামীণফোন (জিপি)। গতকাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) এমন প্রস্তাব দেয় দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটরটি। তবে গ্রামীণফোনের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বিটিআরসি।
বিটিআরসি জানিয়েছে, সর্বোচ্চ আদালত গ্রামীণফোনকে ইতিমধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এর বাইরে যেতে পারে না।
জিপি এমন সময়ে এ প্রস্তাবটি দিল, যখন আপিল বিভাগে একই অডিট বিষয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদন শুনানির মাত্র এক দিন বাকি আছে। এর আগে আপিল বিভাগ গত বছরের ২৪ নভেম্বর গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে বিটিআরসিকে দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়, যার শেষ সময় হচ্ছে ২৩ ফেব্রুয়ারি। যদিও গত ২৬ জানুয়ারি বিটিআরসিকে ১২ কিস্তিতে মোট ৫৭৫ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আদালতে আবেদন জানায়, যা আজ শুনানি হতে পারে বলে গ্রামীণফোন সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের পরিচালক ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সের প্রধান হোসেন সাদাত বলেন, আলোচনায় আমাদের সদিচ্ছা প্রকাশ করতে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো অডিট দাবির যথার্থতা বিবেচনায় এনে একটি সমাধানে পৌঁছানো, যেটি চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে বিকল্প একটি উদ্যোগ। কিন্তু বিটিআরসি আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এ বিষয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে হোসেন সাদাত বলেন, আলোচনার মাধ্যমে স্বচ্ছ ও গঠনমূলকভাবে বিরোধপূর্ণ অডিট আপত্তি সমাধানে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে আসছে গ্রামীণফোন। ধারাবাহিক এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধপূর্ণ অডিটের বিষয়টি সমাধান প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নিতে গ্রামীণফোন বিটিআরসিতে ১০০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। গ্রামীণফোন আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করে এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিটিআরসি গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি ফ্রেমওয়ার্ক ও পদ্ধতিতে সম্মত হবে। তবে ১০০ কোটি টাকার প্রস্তাবে বিটিআরসি অপারগতা প্রকাশ করেছে।
গ্রামীণফোনের ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপিল বিভাগ দুই হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সেখানে আমরা আপিল বিভাগের নির্দেশনার বাইরে কীভাবে ১০০ কোটি নেব। আদালতে তারা গিয়েছেন, আমরা নই। এটি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং এটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত পেলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপে যাব।
জহুরুল হক বলেন, গ্রামীণফোনের প্রস্তাবে আমরা তাদের বলেছি, হয় আদালতে যাবেন, অথবা দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। এখন আদালত যদি কমিয়ে দেন, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। তবে এর আগে আমরা আলোচনা শুরু করতে ১০০ কোটি টাকা করে ২০০ কোটি টাকা তাদের কাছে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন তারা আসেননি। এখন বৃহস্পতিবার কোর্টের আদেশ না হলে আমাদের রিসিভার নিয়োগ দিতে হবে। এমন অবস্থায় গ্রামীণফোন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।
বিভিন্ন খাতে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি (বিটিআরসির ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ও এনবিআরের ৪ হাজার ৮৬ কোটি) টাকা পাওনা হিসেবে দাবি করে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে গত বছর ২ এপ্রিল চিঠি দেয় বিটিআরসি। বিটিআরসি সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে রাজি না হওয়ায় দুই অপারেটর আদালতের দ্বারস্থ হয়। ওই পাওনা দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে গ্রামীণফোন নিম্ন আদালতে একটি মামলা করে ও পাওনা দাবির অর্থ আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চায়। গত বছর ২৮ আগস্ট ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নামঞ্জুর করে। এর বিরুদ্ধে গ্রামীণফোনের পক্ষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। গত ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট ওই অর্থ আদায়ের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ আদেশ স্থগিত চেয়ে বিটিআরসি আবেদন করে, যা চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আসে।
শুনানি শেষে গত বছর ২৪ নভেম্বর গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে আপাতত দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। অন্যথায় গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির দাবি করা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপর হাইকোর্টের জারি করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে যাবে বলেও সতর্ক করে আদালত।