রাজধানীর মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের (জাগৃক) বাস্তবায়নাধীন স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্পের প্রথম পর্বের কাজ প্রায় শেষ। সেখানে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ১০টি ভবন। ইতিমধ্যে এই ১০টি ভবনের প্রায় ১ হাজার ফ্ল্যাট প্রস্তুত করে বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছে হস্তাস্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু সরকারি এ আবাসনে শেষ মুহূর্তে এসে বৈদ্যতিক তার পরিবর্তনের নামে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্পের প্রতিটি ভবনে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র বসানোর জন্য ৬ আরএম (তারের সাইজ) তার ব্যবহারের সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী শেষ মুহূর্তে এসে ৬ আরএমের পরিবর্তে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন কেব্ল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে প্রতিটি ভবনের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে ব্যয় বাড়িয়েছেন। সেই অনুযায়ী ১৬ আরএম কেব্্ল ইতিমধ্যে ভবনে লাগানো হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এতে ১০টি ভবনের তারের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে আড়াই কোটি টাকা লুটপাটের সব ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে সংশ্লিষ্টরা। একই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্বে নির্মাণাধীন আরও ১০টি ভবনে জাগৃকের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিরাজ হোসেন একই ধরনের কর্মকাণ্ডের দাপ্তরিক প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে তিনি গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জাগৃকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের শুরুর দিকে মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে বিভিন্ন আয়তনের আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ শুরু করে সংস্থাটি। ১০টি ভবনে মোট ১ হাজার ফ্ল্যাট স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য একটি করে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্য কারিগরি দিক মূল্যায়ন করে ৬ আরএমের কেব্্ল নির্ধারণ করে প্রকল্পের শুরুতেই যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ অনুমোদন দেয়। নির্ধারিত এই কেব্্লের জন্য বাজেট প্রণয়ন করে সব নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের শেষ দিকে এসে তারের সাইজ পরিবর্তনের নামে প্রতিটি ভবনে শুধু কেব্্লের জন্য ২৫ লাখ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে জাগৃকের ইএম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন। নতুন করে শুধু কেব্্লের জন্য আড়াই কোটি টাকা ব্যয় বাড়ছে। তবে স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকই এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ব্যয় বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় নেই যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অনুমতিও।
জাগৃকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্পে দুই ভাগে কাজ চলছে। একটি হলো সিভিল অংশ এবং আরেকটি ইএম (ইলেকট্রিক মেকানিক্যাল)। ইএম অংশের দায়িত্বে আছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মিরাজ হোসেন। তিনি প্রকল্প পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কারও সঙ্গে সমন্বয় না করে তারের সাইজ বাড়ানোর নামে প্রতিটি ভবনে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়েছেন। ইতিমধ্যে ৭-৮টি ভবনে তার লাগানো শেষও করেছেন। এখন বিল দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই ১০টি ভবনে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম ঘটানোর পর সংস্থাটির আরেকটি প্রকল্পে একই কাজ করা হচ্ছে। সেখানে ১০টি ভবনে একইভাবে তারের সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে ২৫ লাখ টাকা করে ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দুটি ধাপে হওয়া সরকারের এই আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্পে শুধু তার পরিবর্তনের নামে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আড়াই কোটি টাকা কেব্লের জন্য ব্যয় বাড়াতে সিভিল অংশের খরচ কমানো হয়েছে। আবার ডিপিপিতে থাকা ইএম অংশের কিছু উপকরণ : যেমন ফ্যান-লাইট বাদ দেওয়া হয়েছে। যাতে ফ্ল্যাটের দাম না বাড়ে। কারণ ফ্ল্যাটের দাম বাড়ালে বিষয়টি ফ্ল্যাট বরাদ্দগ্রহীতাদের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি করতে পারে। তাই সমালোচনা এড়াতে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাগৃকের প্রকল্প পরিচালক বিজয় কুমার ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী ৬ আরএম তারের স্থলে ১৬ আরএমের তার কয়েকটি ভবনে লাগিয়েছে। এতে আমার কোনো অনুমোদন নেয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি আমার নজরে আসার পর সে (নির্বাহী প্রকৌশলী) দুঃখ প্রকাশ করেছে। আমরা এখন এটা কীভাবে সমাধান করা যায় সেদিকে নজর দিয়েছি। আমাদের হাতে এখনো সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। কারণ ঠিকাদারকে এখনো বিল দেওয়া হয়নি।’
সিভিল অংশ ও ডিপিপিতে থাকা উপকরণ বাদ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, ‘ফ্ল্যাটের দাম যাতে না বাড়ে, সে জন্য আমরা সিভিল আইটেমে, লাইটসহ কিছু জিনিস কাটছাঁট করেছি।’