সমৃদ্ধির পথ বানাবে বসুন্ধরা বিটুমিন : অর্থমন্ত্রী

টেকসই ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাস্তা বানাবে বসুন্ধরা বিটুমিন। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই করে বিশ্বসেরা মান নিশ্চিত করে বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিটুমিন যেমন দেশের রাস্তাঘাটকে পোক্ত করবে, তেমনি বিদেশে রপ্তানি করে আয় করবে বৈদেশিক মুদ্রা। বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্টের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে দেশের সড়ক-মহাসড়ক টেকসই না হওয়ার যে আক্ষেপ রয়েছে, তা দূর হবে। গতকাল শনিবার কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে বেসরকারি উদ্যোগে বসুন্ধরা গ্রুপ স্থাপিত ‘বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্ট’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এসব কথা বলেন।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া, বসুন্ধরা গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সাদাত সোবহান তানভীর, ভাইস চেয়ারম্যান সাফিয়াত সোবহান সানভীর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর ও ওয়ালিদ সোবহান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেরানীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ, রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল, রূপায়ণ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মাহির আলী খাঁন রাতুলসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অসংখ্যবার আক্ষেপ করে বলেছেন, আমাদের দেশের রাস্তাঘাট কবে বিদেশের মতো হবে? বিভিন্ন সভার ভেতরে ও বাইরে তিনি বারবার এ আক্ষেপ করেছেন। আমাদের দেশে বৃষ্টি বেশি হয়, পানির সামান্য স্পর্শ পেলেই বিটুমিনের রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়। বিটুমিন নিয়ে আমরা একধরনের জেহাদ করেছি। আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই ও টেকসই বিটুমিন কোথাও পাইনি। বিভিন্ন রাস্তায় আমদানি করা বিটুমিন ব্যবহার হয়েছে, নানা কিছু মেশানো হয়েছে। তা টেকসই হয়নি। ফলে আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছি, তা পূরণ করতে পারেনি। আজ আমরা আনন্দিত যে বসুন্ধরা গ্রুপ আমাদের সেই আক্ষেপ দূর করার সুযোগ এনে দিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিটুমিন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। এটা দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন।’

বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সোনার বাংলা একটি দর্শন। সোনার বাংলায় কোনো দারিদ্র্য, বঞ্চনা থাকবে না। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। আমরা শুধু সোনার বাংলা গড়ে তোলাই নয়, বিশ্ব মানচিত্রে উন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলব। সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেব।’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের প্রশংসা করে নসরুল হামিদ বলেন, সোবহান সাহেবের ছেলে আনভীর, বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে এসে বাবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। তার সন্তানরা চাইলে বিদেশে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারতেন। সন্তানদের এভাবে গড়ে তোলাই বাপের বড় সফলতা।’ তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরার বিভিন্ন কারখানায় হাজার হাজার মানুষ কাজ করছেন। দেশ ও মানুষের কল্যাণে বসুন্ধরা গ্রুপ বিপুল অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করছেন। এই গ্রুপের সব শিল্পই বেসিক শিল্প। তারা অর্থ-বিত্তের জন্য বিনিয়োগ করছেন না। মানুষের কল্যাণে ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে বিনিয়োগ করছেন।’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ ৩০টি শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছে, বড় বড় আবাসিক প্রকল্পও বাস্তবায়ন করছে। বসুন্ধরা গ্রুপ কখনো নিজের জন্য করে না, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বসুন্ধরা গ্রুপ কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি আজ অনেক বদলে গেছে।’

‘আমাদের এই সফলতার পেছনে রয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উনি জীবিত থাকলে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে যে পর্যায়ে রয়েছে, আরও ২৫ বছর আগেই এটি সম্ভব হতো। একসময় বাংলাদেশকে বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। এখন সারা দুনিয়া বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে।’ যোগ করেন আহমেদ আকবর সোবহান।

প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘রিহ্যাবের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রিহ্যাবের সদস্যদের সবাই ধনী। সভা শেষে তিনি বললেন, আপনারা খেলাধুলার দিকেও একটু নজর দিন। বাংলাদেশ ক্রিকেট যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার ৯৯ শতাংশ কৃতিত্বই প্রধানমন্ত্রীর। তিনি প্রত্যেকটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, এসএমএস পাঠান। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এরা একদিন মূল বিশ্বকাপেও চ্যাম্পিয়ন হবে, সেদিন বেশি দূরে নয়। বিশ্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ক্রিকেট ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশকে চিনছে।’

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সব সময় সবক্ষেত্রে উৎসাহ দেন। তিনি আমাদের বলেন, আরও বেশি বিনিয়োগ করেন, দেশকে এগিয়ে নেন। আমি আপনাদের পাশে আছি। আমার ছেলেরা বিদেশ থেকে ফিরে আসার কারণ হলো দেশে এখন ব্যবসার পরিবেশ আছে। গত ৫ বছরে একদিনও হরতাল দেখিনি। আগে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকতাম, ভাবতাম, কবে হরতাল-অবরোধ শেষ হবে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের হরতাল-অবরোধ থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রী মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন যে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেবেন। এই একটি মাত্র সিদ্ধান্তে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়ে গেল। এই সিদ্ধান্তের কারণে দ্বিগুণ রেমিট্যান্স আসবে বাংলাদেশে।’ তিনি বলেন, ‘মোংলা, মেঘনা ও কেরানীগঞ্জে আমাদের ফ্যাক্টরি আছে। একটি দিনের জন্যও কোনো সমস্যা হয়নি।’ 

নির্বাচনের আগে এফবিসিসিআইর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে আহমেদ আকবর সোবহান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দলমত-নির্বিশেষে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দিয়েছিলাম। আমিও সেই অনুষ্ঠানে ছিলাম। সমর্থন দেওয়ার কারণ হলো, দেশের সবার উন্নতি হচ্ছে, হবে। প্রধানমন্ত্রীর চরম শত্রুও বাংলাদেশের উন্নতির কথা স্বীকার করে। আর কোনো রাজাকারের গাড়িতে পতাকা দেখতে চাই না।’

বসুন্ধরা গ্রুপ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান। আমাদের সন্তানরা আমাদের থার্ড জেনারেশনও আমাদের সাথে আছে। এবং আমরা সবাই একসাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছি। আমি আর শেখ কামাল একসঙ্গে ছাত্রলীগ করতাম। সে নাই, আমাদের দুর্ভাগ্য। খেলাধুলায় তার যে অবদান! আমাদের বড় ভাই প্রথম আবাহনী ক্লাবের ক্যাপ্টেন হলো। শেখ কামালের খেলার প্রতি যে ভালোবাসা আর মমত্ববোধ ছিল আমি আর কারও মাঝে তা দেখিনি। এখন একমাত্র শেখ হাসিনার মাঝে তা দেখি। আমরা একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স করছি, একটা ক্রিকেট একাডেমি করব। ইনশা আল্লাহ সে একাডেমির নাম আমরা শেখ রাসেলের নামে করব।’

আহমেদ আকবর সোবহান বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটা শিশুকে দেখলে আমার শেখ রাসেলের কথা মনে পড়ে। এই যে তার অন্তর্দহনÑ এটা শুধু উনিই বোঝেন। এ ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনভীর, সে শেখ রাসেল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট গত পাঁচ বছর ধরে। আমার ছোট ছেলে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট গত চার বছর ধরে। ইনশা আল্লাহ শেখ রাসেল ক্রিকেট একাডেমি থেকে লাখো ক্রিকেটার বেরিয়ে আসবে এবং শেখ রাসেলকে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সব সময় দেখতে পাবেন ওই শিশুদের মাঝে।’

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গত অর্থবছর দেশে বিটুমিনের চাহিদা ছিল ৫ লাখ ১০ হাজার টন। প্রতি বছর দেশে বিটুমিনের চাহিদা বাড়ছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। এর মধ্যে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি ৬০ হাজার টন বিটুমিন উৎপাদন করেছে, বাকি সাড়ে ৪ লাখ টন আমদানি হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপ ৯ লাখ টন বিটুমিন উৎপাদন করবে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্টে ১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, প্ল্যান্টটিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও বাতাস ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তিও সংযুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একই সঙ্গে সময়মতো চাহিদার জোগান এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতে বসুন্ধরা গ্রুপই দেশে প্রথমবারের মতো বিটুমিন উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই কারখানায় উৎপাদিত বিটুমিন মানগত দিক দিয়ে সাধারণ বিটুমিনের চেয়ে আরও উন্নত হবে। এটি হবে বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডের বিটুমিনের সঙ্গে তুলনীয়। এ ছাড়া ক্রেতার চাহিদামতো গ্রেড ও মানের বিটুমিন সরবরাহ করা যাবে। বসুন্ধরা বিটুমিন কারখানাটি স্টেট অব আর্ট অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে রয়েছে উন্নতমানের সব সেবা ও সুযোগ-সুবিধা। ক্রেতাকে চাহিদা অনুয়ায়ী সময়মতো ড্রাম বা বাল্ক আকারে বিটুমিন সরবরাহ দেওয়ার জন্য কারখানা এলাকায় দক্ষ ও মানসম্পন্ন সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে। নতুন কারখানাটি চাহিদা অনুযায়ী উন্নত গ্রেডের বিটুমিন উৎপাদন করবে। কাটব্যাক, এমালসিফাইড, অক্সিডাইজড, পলিমারসহ (এসবিএস, রাবার পাউডার) ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহে সক্ষম এই প্ল্যান্ট।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি অভ্যন্তরীণভাবে কিছু বিটুমিন উৎপাদন করে। চাহিদার বাকি ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর আমদানি করা বিটুমিনের মান নিয়ে প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে বারবার। বলা হয়েছে, নিম্নমানের হওয়ায় এসব বিটুমিন সড়কে ব্যবহারের পর তা টেকসই হচ্ছে না। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের সদ্ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশেই সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন বিটুমিন উৎপাদনের পরিকল্পনা পুরো অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ইতিবাচক বড় ভূমিকা রাখবে। আর বসুন্ধরা বিটুমিন প্ল্যান্টটিও স্থাপন করা হয়েছে সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে। এখানে আদর্শ বিপণনব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। বিটুমিনের পাশাপাশি এই প্ল্যান্টে জ্বালানি তেলসহ কিছু বাই-প্রডাক্টও উৎপাদন করা হবে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ হিসেবে বসুন্ধরা এরই মধ্যে সিমেন্ট, পেপার, টিস্যু, এলপিজি উৎপাদন ও বিপণন, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে।