রাজধানীর অপরাধজগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ ওরফে জিসানের অন্যতম সহযোগী মাজহারুল ইসলাম ওরফে শাকিলকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল শনিবার ভোরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির কর্মকর্তারা। জিসানের নির্দেশে রাজধানীর অপরাধজগতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই এক মাস আগে দুবাই থেকে শাকিল ঢাকায় আসেন বলে ভাষ্য র্যাবের।
দীর্ঘদিন ধরে শাকিল দুবাই থেকে জিসানের পক্ষে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে আসছিলেন বলে অভিযোগ আছে। গত জানুয়ারি মাসে দেশে ফেরার পর থেকেই
তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন। তবে শাকিলের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে তাকে ধরে নিয়ে যান র্যাব সদস্যরা।
শাকিলকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের কারণে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। নতুন করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতেই শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় শাকিল দেশে আসেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। সেই তথ্য পেয়ে তাকে ধরতে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আজ ভোরে (গতকাল শনিবার) ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শাকিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।’
এই র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সিটি নির্বাচন সামনে রেখে দুবাই থেকে দেশে আসেন শাকিল। মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশেই তিনি দেশে আসেন।’
শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে লে. কর্নেল সারওয়ার বলেন, ‘আমরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে জানতে পেরেছি জিসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে তা চলমান। এ বিষয়ে শাকিলের কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।’
র্যাবের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘শাকিল রোগী সেজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি হন। সেখানে ভর্তির উদ্দেশ্য ছিল, হাসপাতালের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। এ জন্য তিনি বেশ কয়েকবার হাসপাতালের সিসিইউর সামনে ঘোরাফেরা করেন। যেখানে যুবলীগের গ্রেপ্তারকৃত সাবেক নেতা সম্রাট চিকিৎসাধীন আছেন। তবে কয়েক দিন ধরে শাকিলকে হাসপাতালে দেখা যাচ্ছিল না।’
শাকিলকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের জুন মাসে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসম্পাদক রাজীব হত্যাকা-ের ঘটনায় নাম চলে এলে চীন চলে যান শাকিল। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে বসবাস করেন ও কার্গো সার্ভিসে কাজ করেন। ২০১৮ সালে চীন থেকে দুবাই চলে যান। সেখানেই জিসানের সঙ্গে তার পরিচয় এবং সখ্য গড়ে ওঠে।
এদিকে শাকিলের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কেবিন থেকে শাকিলকে ধরে নিয়ে যান র্যাব সদস্যরা। অথচ গতকাল দুপুরে তাকে অস্ত্র ও গুলিসহ আটক দেখানো হয়েছে। হৃদরোগের কারণে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার দেখাশোনার জন্য শাওন নামে আরও একজন সেখানে ছিলেন। শাওনকেও ধরে নিয়ে যায় র্যাব।
শাকিলের চাচাতো ভাই ফাহিম মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘শাকিলের হার্টের সমস্যা রয়েছে এবং ব্লাড প্রেশারও বেশি। মাথা ঘুরে পড়ে গেলে ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে প্রথমে ধানম-ির একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরের দিন তাকে ভর্তি করা হয় বিএসএমএমইউতে। ওই দিন রাতে শাওন ও শাকিলকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। তাদের খোঁজ না পেয়ে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরে আজ (গতকাল) দুপুরে টেলিভিশনে দেখতে পাই, মোহাম্মদপুর থেকে র্যাব শাকিলকে অস্ত্রসহ আটক করেছে। তবে শাওনের কোনো খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।’