জাগৃকের প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার কথা সম্প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও উচ্চারিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া জনগণের শ্রম ও ঘামের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।  কিন্তু দেশের মানুষ এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল কতটা ভোগ করতে পারছে বা পারবে তা নির্ভর করে মূলত দুটো বিষয়ের ওপর। এক. প্রকল্পগুলো কতটা সুপরিকল্পিত; দুই. প্রকল্পগুলো কতটা অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি এখন এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে যে, প্রকল্প প্রণয়নের সময় বা প্রকল্পের পরিকল্পনাতে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতির নীলনকশা প্রস্তুত করা যেন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পে অনুমোদন ছাড়া ফ্ল্যাটের বৈদ্যুতিক লাইনের তারের পরিবর্তন করে অর্থ লোপাটের খবর মিলেছে।

গত রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘বৈদ্যুতিক তার বদলের নামে আড়াই কোটি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে,  রাজধানীর মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে জাগৃকের বাস্তবায়নাধীন স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্পের প্রথম পর্বের কাজ প্রায় শেষ। সেখানে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ১০টি ভবন। ইতিমধ্যে এই ১০টি ভবনের প্রায় ১ হাজার ফ্ল্যাট প্রস্তুত করে বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সরকারি এ আবাসনে শেষ মুহূর্তে এসে বৈদ্যুতিক তার পরিবর্তনের নামে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছেন।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে বিভিন্ন আয়তনের আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ শুরু করে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ।  ১০টি ভবনে মোট ১ হাজার ফ্ল্যাট স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য একটি করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের জন্য কারিগরি দিক মূল্যায়ন করে ৬ আরএমের কেবল নির্ধারণ করে প্রকল্পের শুরুতেই যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ অনুমোদন দেয়। নির্ধারিত এই কেব্লের জন্য বাজেট প্রণয়ন করে সব নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের শেষ দিকে এসে তারের সাইজ পরিবর্তনের নামে প্রতিটি ভবনে শুধু কেব্লের জন্য ২৫ লাখ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন জাগৃকের ইএম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী। এতে নতুন করে শুধু কেব্লের জন্য আড়াই কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে।

যে কোনো সরকারি প্রকল্পে পুনর্মূল্যায়নের আইনগত সুযোগ রয়েছে।  সেই পুনর্মূল্যায়নে ক্ষুদ্র পরিসরেও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।  কিন্তু সেজন্য প্রকল্প পরিচালক মারফত যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু জানা গেছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের এই প্রকল্পে ভবনগুলোতে তারের সাইজ পরিবর্তনের এই বিষয়টি সম্পর্কে স্বয়ং প্রকল্প পরিচালকই অবগত নন। এ ছাড়া ব্যয় বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় নেই যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অনুমতিও।

পাশাপাশি, জাগৃকের এই প্রকল্প যেহেতু স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য, তাই মূল পরিকল্পনায় ফ্ল্যাটগুলোর যেকোনো একটি রুমে এসির সকেট লাগানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী চারটি রুমেই এসির সকেট লাগিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো দেশের স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ কি চারটি রুমে এসি লাগানোর সক্ষমতা রাখেন? আর সরকারের অন্যান্য প্রকল্পে একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) থাকলেও জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের এ প্রকল্পে মাত্র একজন নির্বাহী প্রকৌশলী রয়েছেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন থাকায় তার পক্ষে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা ভোগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি প্রকল্পে এরকম অর্থ লোপাটের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।  অবশ্য প্রকল্পে দুর্নীতি বা অর্থ তছরুপের দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে।  সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতি বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের অলিখিত দায়মুক্তিকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকার মতো অর্থনৈতিক প্রগতির খবর যেমন আশা জাগানিয়া, তেমনি সর্বগ্রাসী দুর্নীতির খবর সেই আশাভঙ্গের কারণ। কেননা, দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কাজেই দুর্নীতি রোধে সরকারের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত।