বিটিআরসিকে ১০০০ কোটি টাকা দিল গ্রামীণফোন

নিরীক্ষা আপত্তির প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) পরিশোধ করেছে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন। আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল রবিবার বিকেলে বিটিআরসি কার্যালয়ে কমিশন চেয়ারম্যানের কাছে এক হাজার কোটি টাকার পে-অর্ডার তুলে দেন অপারেটরটির হেড অব রেগুলেটরি হোসেন সাদাত।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ সোমবারের মধ্যে বিটিআরসিকে এক হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয় গ্রামীণফোনকে। নির্দেশনা অনুযায়ী রবিবার টাকা পরিশোধ করবে জানিয়ে গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায় গ্রামীণফোন। 

পে-অর্ডার পাওয়ার পর বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক গ্রামীণফোনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা আদালতের নির্দেশ মেনে এক হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের মনোমালিন্য নেই। তবে অনেক দিন ধরে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছিল। আজ সংবিধান রক্ষা হলো, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ রক্ষা হলো। এ সরকার তার প্রাপ্য অর্থের কিছু হলেও পেল, যা জনগণের টাকা। টাকা দেওয়ার জন্য গ্রামীণফোনকে ধন্যবাদ দিই, দেরি হলেও ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছে, টাকাটা দেওয়াই যখন লাগবে, দিয়ে দিয়েছে তারা।’

তিনি বলেন, ‘হয়ত কোনো ব্যাপারে আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে সমস্যা হয়েছিল, তারা মনে করেছিল কোর্টে গিয়ে হয়ত কিছু কম পাবে। অনেক টাকাৃ বিলম্ব করতে পারলে ব্যবসায়িক লাভ হবে। গ্রামীণফোন শেষে হলেও মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং থেকে প্রোপার আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে এসেছে, এটি আমাদের জন্য খুব সুখের খবর।’

গ্রামীণফোনের এনওসির বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি কোর্টের আদেশের ওপর নির্ভর করবে। তারা যেহেতু টাকা জমা দিয়েছে, আদালত যেভাবে নির্দেশনা দেবে সেভাবেই আমরা কাজ করব। সোমবার যেহেতু শুনানি রয়েছে, সেখানে নিশ্চয় বিষয়টি আদালতে তুলবে গ্রামীণফোন।’

এদিকে চেক হস্তান্তরের পর গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি হোসেন সাদাত বলেন, ‘আমরা দেশের আইন ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ১০০০ কোটি টাকা জমা দিলাম।’ তিনি বলেন, অডিট নিয়ে আমাদের যে আপত্তি, সেটা এখনো আছে। আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলবে। হয়তো এর মাধ্যমেই একটি সমাধান বেরিয়ে আসবে।’

১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি (বিটিআরসির ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ও এনবিআরের ৪ হাজার ৮৬ কোটি) টাকা পাওনা হিসেবে দাবি করে গ্রামীণফোন লিমিটেডকে গত বছরের ২ এপ্রিল চিঠি দেয় বিটিআরসি। রবি অজিয়াটার কাছে বকেয়া ৮৬৭ কোটি টাকা আদায়েও একই ধরনের চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। বকেয়া টাকা আদায় না হওয়ায় গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেয় বিটিআরসি। পরবর্তী সময়ে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ২২ জুলাই বিভিন্ন ধরনের সেবার অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়া বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। এতেও বকেয়া আদায়ে অগ্রগতি না হওয়ায় গত বছরে ৫ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দিয়ে দুই অপারেটরকে নোটিস পাঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণফোনে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হয়।

বিটিআরসি সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তিতে রাজি না হওয়ায় গ্রামীণফোন গত বছর আদালতের দ্বারস্থ হয়। পরে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগে গ্রামীণফোন ও বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হলেও তাতে সফলতা আসেনি। পাওনা দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে গ্রামীণফোন নি¤œ আদালতে একটি মামলা করেও পাওনা দাবির অর্থ আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চায়। গত বছরের ২৮ আগস্ট ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নামঞ্জুর করেন। এর বিরুদ্ধে গ্রামীণফোনের পক্ষে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। গত ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট ওই অর্থ আদায়ের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন। এই আদেশ স্থগিত চেয়ে বিটিআরসি আবেদন করে, যা চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আসে।

শুনানি শেষে গত বছরের ২৪ নভেম্বর গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে আপাতত দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। অন্যথায় গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির দাবি করা সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপর হাইকোর্টের জারি করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হয়ে যাবে বলেও সতর্ক করেন আদালত। তবে আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই গত ২৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগে আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায় গ্রামীণফোন। পুনর্বিবেচনার আবেদনে আপাতত ১২ মাসের কিস্তিতে ৫৭৫ কোটি টাকা দেওয়ার আবেদন জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে আলোচনা চালু রাখতে বিটিআরসিকে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয় গ্রামীণফোন। তবে বিটিআরসি সেই টাকা ফিরিয়ে দেয়। এরপর গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানিতে দুই হাজার কোটি টাকা ছয় মাসে পরিশোধের প্রস্তাব দেন গ্রামীণফোনের আইনজীবী। তবে আপিল বিভাগ তাদের আবেদনে সাড়া না দিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এক হাজার কোটি টাকা বিটিআরসিকে পরিশোধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আজ (সোমবার) গ্রামীণফোনের পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর আদেশের দিন ধার্য রাখে আপিল বিভাগ।