ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার না করার নির্দেশনা দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘আগামীতে নির্বাচনী আচরণবিধি পরিবর্তন হবে। জাতীয় পর্যায়ের জন্য আমরা বিধিই পরিবর্তন করে ফেলব।’
গতকাল রবিাবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
দূষণমুক্ত নির্বাচনী প্রচারে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পাঁচ দফা প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন সব প্রার্থী। ফলে এ নির্বাচনের প্রচার হবে দূষণমুক্ত। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রচারে এ বদল আনছে কমিশন। এসএসসি পরীক্ষার প্রসঙ্গ টেনে সিইসি বলেন, ‘বাচ্চাদের পরীক্ষার সময় মাইক বাজিয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে; কোনো দেশে মাইক বাজিয়ে ভোট চাওয়া হয় নাকি? মেসাকার হয়ে গেছে।’
দূষণমুক্ত নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা (দূষণমুক্ত প্রচার) পাইলট প্রকল্প, পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।’ এ নির্বাচনের প্রচারে এমন নিয়ন্ত্রণ আনতে বিধির বদল হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিধির পরিবর্তন আনতে হবে না; এ কারণেই তো আমরা সমঝোতা করেছি।’
সভায় ইসির পক্ষে দূষণমুক্ত প্রচারের জন্য পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ঢাকা-১০ উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা জিএম শাহতাব উদ্দিন। কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গে প্রার্থীদের চিন্তার সংযোজন-বিয়োজনে সমঝোতা হয়েছে আলোচনায়।
ইসির পাঁচটি প্রস্তাব ও প্রার্থীদের মত : প্রার্থীরা আচরণ বিধিমালায় বর্ণিতসংখ্যক নির্বাচনী ক্যাম্প অনুমোদিত স্থায়ী স্থাপনায় স্থাপন করবেন। ক্যাম্পগুলোতে প্রার্থীরা পোস্টার, ব্যানার, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করতে পারবেন। সিটি করপোরেশন আইনে অনুমোদিত ডেসিবেল মাত্রায় মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন। সভায় এ বিষয়ে সব প্রার্থী সম্মত হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন আসনের ২১টি জায়গা নির্ধারণ করেছে। সব প্রার্থী সেখানে নিজ নিজ স্ট্যান্ড স্থাপন করে পোস্টার ঝোলাতে পারবেন। এক একটি জায়গায় পর্যায়ক্রমে সব প্রার্থী শব্দযন্ত্র ব্যবহার করে আচরণ বিধিমালায় বর্ণিত সময়কালে প্রচার চালাতে পারবেন।
প্রার্থীরা নির্ধারিত স্থানে শোভাযাত্রা, পদযাত্রা সীমিত রাখবেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম আপত্তি জানিয়ে শোভাযাত্রার সংখ্যা নির্দিষ্ট করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কমিশন প্রত্যেক দলের প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি শোভাযাত্রার বিধান নির্দিষ্ট করে দেয়। নির্ধারিত কর্র্তৃপক্ষ প্রত্যেক প্রার্থীকে এ লক্ষ্যে নির্দিষ্ট দিন, সময় নির্ধারণ করে দেবেন, এ প্রসঙ্গে সবাই একমত হন।
নির্বাচন কমিশন জনসভার জন্য এক বা একাধিক জায়গা নির্দিষ্ট করে দেবে। ওই নির্ধারিত স্থানে কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে সভার আয়োজন করবে বলে প্রস্তাব করা হয়। তখন সব প্রার্থী বলেন, (শোভাযাত্রা থাকলে) তারা কোনো জনসভা করবেন না।
এছাড়া কোনো তোরণ নির্মাণ করা যাবে না, রাস্তার ফুটপাতে কোনো ক্যাম্প করা যাবে না, রাস্তায় কোনো পথসভা করা হবে না, সর্বোপরি নির্বাচনী পরিবেশ বিঘিœত হয় এমন কোনো কার্যক্রম হতে সবাইকে বিরত থাকতে ইসি প্রস্তাব করেছে।
এসব প্রস্তাব উত্থাপনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচার এমন ছিল যে পোস্টারের জন্য চাঁদ, সূর্য কিছুই দেখা যেত না। এসব কারণে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। সংসদ নির্বাচন অথবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এত পোস্টার, ব্যানার, এত মাইকিংয়ের প্রয়োজন আছে কি, কোনো দেশের নির্বাচনে এমন করে কি? তারা না করলে আমরা করব না। কেন আমাদের শহরটাকে দূষিত করব। ঢাকা সিটির নির্বাচনে নাকি ২৫ টন পলিথিনের পোস্টার তৈরি হয়েছে, এগুলো কোথায় যাবে? তাই আমরা এ নির্বাচনের প্রচারের জন্য ২১টি জায়গা নির্ধারণ করেছি। রাস্তার যেখানে সেখানে পোস্টার না টানিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নির্বাচনী যে অফিস থাকবে, প্রয়োজনে কমিশন নিজের খরচে বোর্ড টানিয়ে দেবে, সেই বোর্ডে ছয়জন প্রার্থী পোস্টার লাগাবেন। যে ২১টি স্থান রয়েছে, যে যার খরচে ডিজিটাল বোর্ড করতে পারেন।’
পরে প্রার্থীদের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ভোটারদের সুবিধার্থে গণপরিবহন সচল রাখার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, বিলবোর্ডে প্রচারের সুযোগ দিতে হবে। ভোটের আগে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দেখার সুযোগ দিতে হবে।
বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম বলেন, এজেন্টদের নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। তাদের বের করে দেওয়া হয়। এজেন্টদের কেন্দ্রে যাওয়া, অবস্থান ও বাড়িতে ফেরার নিরাপত্তা দিতে হবে, অন্যথায় নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে এজেন্ট তুলে দিতে হবে।
আলোচনায় জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. শাহজাহান বলেন, নির্দিষ্ট স্থানে প্রচার চালালে অলিগলিতে তা সম্ভব হবে না। এতে ভোটাররা প্রার্থী সম্পর্কে জানতে পারবেন না। তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম। কীভাবে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো যায়, তা ভেবে দেখা উচিত। এজেন্টরা যাতে নিরাপদে কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারেন, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইসিকে সেই ভূমিকা পালন করতে হবে। পরে অন্য প্রার্থীরাও বক্তব্য দেন।
প্রার্থীদের সমর্থন নেওয়ার পর সিদ্ধান্তগুলো তুলে ধরেন সিইসি। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ডে একটা করে অফিস রাখতে পারবেন। এর বাইরে একেবারেই মাইক বাজাতে পারবেন না। নির্ধারিত ২১ জায়গায় পোস্টার টানাতে পারবেন। আর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে অফিস করবেন, সেখানে পোস্টার টানাতে পারবেন। এর বাইরে কোথাও বা রাস্তা, অলিগলিতে পোস্টার টানাতে পারবেন না। আর লেমিনেটেড পোস্টার টানাতে পারবেন না। ঢাকা-১০ আসনের জন্য গাড়ি চলাচল উন্মুক্ত করলাম। শুধু মোটরসাইকেল চলবে না।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা-১০ আসনের ভোটের দিন অফিস খোলা থাকবে। আমরা সার্কুলার জারি করে দেব, যাতে অফিস থেকে গিয়ে কর্মকর্তারা ভোট দিতে পারেন।’
মনোনয়ন দাখিলকারী ৬ প্রার্থীই বৈধ : ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ছয় প্রার্থীকেই যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা জিএম শাহতাব উদ্দিন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ইটিআই ভবনে প্রার্থীদের উপস্থিতিতে এ বৈধতা ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
বৈধ প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগের মো. শফিউল ইসলাম, বিএনপির শেখ রবিউল আলম, জাতীয় পার্টির হাজি মো. শাহজাহান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের নবাব খাজা আলী হাসান আসকারী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মিজানুর রহমান চৌধুরী ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) আব্দুর রহীম।
রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ‘কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে ছোটখাটো ভুল আছে। আমাদের অফিসে এখনই বসব। সেখানে ঠিক করা হবে। বিকেল ৫টার দিকে বৈধদের তালিকা প্রকাশ করব।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন নবনির্বাচিত মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। ডিএসসিসির নির্বাচনে মেয়রপদে প্রার্থী হতে তিনি পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য হয়। এ আসনে ২১ মার্চ ভোটের দিন সামনে রেখে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল গত বুধবার। গতকাল ছিল মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রত্যাহারের সুযোগ শেষে ১ মার্চ প্রতীক বরাদ্দ হবে।