অর্থপাচার আইনে আপন জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে ১৯০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পাঁচটি মামলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে অভিযোগপত্র অনুমোদন চেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এনবিআরের অনুমোদন পাওয়ার পর আদালতে এই অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শুল্ক গোয়েন্দা থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত চিঠিটি দেওয়া হয়।
শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তে দেখা গেছে, আপন জুয়েলার্স বিভিন্ন সময় সাড়ে ১৩ মণ সোনা ও পৌনে ৮ হাজার পিস ডায়মন্ড কিনতে গিয়ে ১৯০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাচার করেছে। এতে কর ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এসব অর্থ পাচার করা হয়।
২০১৭ সালে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে ওই বছর মে মাসে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শাখায় একযোগে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অভিযানে আপন জুয়েলার্সের ৫টি শাখা থেকে জব্দ করা হয় ৫৩৭ কেজি ৫০০ গ্রাম সোনা ও ৭ হাজার ৭৪৩ পিস ডায়মন্ড অলংকার। ওই বছর ১২ আগস্ট গুলশান থানায় ২টি, ধানমন্ডি থানায় একটি, রমনা থানায় ১টি ও উত্তরা পূর্ব থানায় ১টি মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
আপন জুয়েলার্স অলংকার আমদানির বিপরীতে বৈধ কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ শুল্ক গোয়েন্দা বলছে, অর্থপাচার করে চোরাচালানের মাধ্যমে এসব অলংকার দেশে আনা হয়েছে। আর এনবিআরে দেওয়া আয়কর নথিতে তথ্য গোপন করে দেওয়া হয়েছে কর ফাঁকি। ফলে শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তে আপন জুয়েলার্সের মালিক তিন ভাই আজাদ আহমেদ, গুলজার আহমেদ ও দিলদার আহমেদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আপন জুয়েলার্সের সুবাস্তু স্কয়ার শোরুমের মামলায় আসামি করা হয় গুলজার আহমেদ ও আজাদ আহমেদকে। সেখান থেকে জব্দ করা হয় ২০৩ কেজি সোনা ও ২৮৫৯ পিছ ডায়মন্ডের অলংকার। যেখানে জব্দ করা অলংকারের বিপরীতে পাচার হয়েছে ৭৩ কোটি ৬৩ লাখ আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ১১ কোটি ২৭ লাখ।
মৌচাক মার্কেট শো-রুমের রমনা মডেল থানার মামলায় আসামি করা হয় দিলদার আহমেদকে। যেখানে শো-রুমটি থেকে জব্দ করা হয় ৫৪ কেজি ২শ গ্রাম সোনা ও ১৫৮০ পিছ ডায়মন্ড অলংকার। যার বিপরীতে পাচার করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি টাকা।
এনআর কমপ্লেক্স শো-রুমের উত্তরা পূর্ব থানার মামলায়ও আসামি করা হয় দিলদার আহমেদকে। শো-রুমটি থেকে জব্দ করা হয় ৮৯ কেজি সোনা ও ১৪১০ পিস ডায়মন্ডের অলংকার। যার বিপরীতে পাচার করা হয়েছে ৩০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা।
ডিএনসিসি মার্কেট শো-রুমের গুলশান থানার মামলায় আসামি করা হয় আজাদ আহমেদকে। শো-রুমটি থেকে জব্দ করা হয় ৯০ কেজি ৩শ গ্রাম সোনা ও ৩৩৮ পিস ডায়মন্ডের অলংকার। যার বিপরীতে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা।
এছাড়া সীমান্ত স্কয়ার শো-রুমের ধানমন্ডি থানার মামলায় আসামি করা হয় দিলদার আহমেদকে। শো-রুমটি থেকে জব্দ করা হয় ১০১ কেজি সোনা ও ১৫৫৭ পিস ডায়মন্ডের অলংকার। যার বিপরীতে পাচার করা হয়েছে ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। মোট ১৯০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে আর কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে ২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এদিকে আমদানি নীতিমালা হওয়ার পর গত বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে অবৈধ সোনা বৈধ করার সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আর এ সুযোগটি লুফে নেয় আপন জুয়েলার্স। সোনা মেলায় আটক ও মজুদ থাকা অলংকার বৈধ করতে প্রায় ১৪ কোটি টাকা কর দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।