ক্ষমতার শেষদিকে ভারত সফরে এসে নজিরবিহীন অভ্যর্থনা পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল সোমবার ভারতের স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ান অবতরণ করে। বিমান থেকে ট্রাম্প নামলে মোদি তাকে জড়িয়ে ধরে বন্ধু বলে সম্বোধন করেন।
বিমানবন্দরে নাচে-গানে ও শঙ্খ বাজিয়ে ভারতীয় রীতিতে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো হয়। সেখান থেকে সফরসঙ্গীসহ ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গুজরাটের সবরমতি আশ্রমে যান। গুজরাটে জন্মগ্রহণকারী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী এই আশ্রমে ১৩ বছর বসবাস করেছিলেন। বিমানবন্দর থেকে আশ্রম পর্যন্ত আট কিলোমিটার পথে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
বিবিসি জানায়, এখানে ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প হাত দিয়ে চরকা কাটার চেষ্টা করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গান্ধী বিদেশি কাপড়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে এই ধারাটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এরপর আশ্রমের পরিদর্শক বইয়ে ট্রাম্প লিখেন, ‘আমার মহান বন্ধু প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি, এই অপূর্ব সফরের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’
আশ্রম পরিদর্শন শেষে আহমেদাবাদে নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট ভেন্যু মোরেতা স্টেডিয়ামের পথে রওনা দেন ট্রাম্প। স্টেডিয়ামের ২২ কিলোমিটার পথের দুইপাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার লোক ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। এই রোড শোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা শিল্পীরা নিজ নিজ রাজ্যের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত শিল্প উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
মোতেরা স্টেডিয়ামের ‘নমস্তে ট্রাম্প’ মঞ্চে একসঙ্গে হাজির হন ট্রাম্প-মোদি। উপস্থিত এক লাখেরও বেশি লোক ব্যাপক করতালি ও ‘মোদি, মোদি’ ধ্বনিতে স্টেডিয়াম মুখর করে তোলেন।
স্টেডিয়ামে ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়ে মোদি বলেন, ‘১৩০ কোটি ভারতীয়র পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বাগত জানালাম। মেলানিয়া ট্রাম্পের ভারতে আসা আমাদের জন্য বড় সম্মানের বিষয়। ইভাঙ্কা ও জ্যারেডের উপস্থিতিও আমাদের কাছে বড় সম্মানের বিষয়।’
মোদি আরও বলেন, ‘আজ মোতেরা স্টেডিয়ামে নয়া ইতিহাস রচিত হচ্ছে। পাঁচ মাস আগে হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম আমি। আর আজ আহমেদাবাদে এসে ঐতিহাসিক সফরের সূচনা করলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোতেরা যদিও গুজরাটে, কিন্তু এই মুহূর্তে স্টেডিয়ামে যে আবেগ দেখতে পাচ্ছেন, তা গোটা ভারতের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনাকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে স্বাগত। ভারত-আমেরিকার মধ্যে আর শুধুমাত্র অংশদারী নেই। সবকিছু ছাপিয়ে দু’দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমেরিকা সবার জন্য উন্মুক্ত, আর আমরা গোটা বিশ্বকে একটাই পরিবার বলে মনে করি। আমেরিকা স্ট্যাচু অব লিবার্টি নিয়ে গর্বিত, আমরা গর্বিত স্ট্যাচু অব ইউনিটি নিয়ে।’
মোদির ভাষণের পর ট্রাম্প তার বক্তব্যে বলেন, ‘আট হাজার মাইল পেরিয়ে এখানে এসেছি একটা বার্তা দিতে, তা হলো আমেরিকা ভারত ও ভারতবাসীকে ভালোবাসে। এমন সুন্দর একটা স্টেডিয়ামে আপনাদের মাঝে এসে আমি খুব আনন্দিত। ভারতকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন চা-ওয়ালা। সেই চা-ওয়ালা বন্ধু নরেন্দ্র মোদির জন্য আমি গর্বিত। মোদিকে সবাই ভালোবাসে। আমেরিকা ভারতের সবসময়ের বিশ্বস্ত বন্ধু। গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সহিষ্ণু দেশ হিসেবে ভারত নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। আপনাদের একতা বিশ্বের কাছে অনুপ্রেরণা।’
ভাষণে ভারতকে সামরিক হেলিকপ্টার, সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, অ্যাডভান্স এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। দুই দেশের মধ্যে তিনি বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি হবে বলে জানান। এ সময় পাকিস্তানেরও সমালোচনা করেন তিনি। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা দূর করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান।
দুই দিনের এ সফরে আহমেদাবাদ থেকে ট্রাম্প ও তার পরিবার তাজমহল দেখতে আগ্রার উদ্দেশে রওনা হন। সন্ধ্যায় তারা বিমানে করে ভারতের রাজধানী দিল্লি যান। সেখানে আজ দুপক্ষের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।