বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) নিরীক্ষা দাবির বাকি ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে গ্রামীণফোনকে তিন মাস সময় দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। দেশের শীর্ষ এই মোবাইল অপারেটরটির এ-সংক্রান্ত রিভিউ (আদেশ পুনর্বিবেচনা) আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।উল্লিখিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে বিটিআরসির নিরীক্ষা আপত্তি দাবির নোটিসের ওপর হাইকোর্ট যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, সেটি অকার্যকর হয়ে যাবে বলেও আদেশে বলা হয়। পাশাপাশি কোম্পানিটিকে কোনো ঝামেলা ছাড়া ব্যবসা করতে দেওয়ার কথাও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে বিটিআরসির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মাহবুবে আলম ও খন্দকার রেজা-ই-রাকিব। গ্রামীণফোনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন ও মোহাম্মদ মেহেদী হাসান চৌধুরী।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট এক আদেশে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির ওই পাওনা আদায়ের ওপর দুই মাসের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে বিটিআরসি ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। শুনানি নিয়ে ২৪ নভেম্বর আপিল বিভাগ এক আদেশে গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে আপাতত ২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়। পরে সর্বোচ্চ আদালতের এ আদেশ রিভিউ চেয়ে আবেদন করে গ্রামীণফোন। শুনানি নিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগ এক আদেশে বিটিআরসিকে সোমবারের (গতকাল) মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকা দিতে নির্দেশ দেয় গ্রামীণফোনকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই গত রবিবার প্রথম কিস্তিতে ১০০০ কোটি টাকার পে-অর্ডার বিটিআরসির কাছে হস্তান্তর করে গ্রামীণফোন কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল শুনানিতে টাকা পরিশোধের রসিদ আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন গ্রামীণফোনের আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন। এ সময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রশ্ন করেন গ্রামীণফোন বাকি টাকা কবে দেবেন? আমরা বলে দিচ্ছি ব্যবসা করতে দিতে, কোনো ঝামেলা না করতে।
অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন তখন ছয় মাস সময়ের আর্জি জানান। তিনি বলেন, রবি মাত্র ১২০ কোটি টাকা কিস্তিতে পরিশোধের জন্য ৬ মাস সময় পেয়েছে। আর আমরা ২ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছি। এরপর গ্রামীণফোনের আইনজীবী ২০০ কোটি করে পাঁচটি সমান কিস্তিতে বাকি ১ হাজার কোটি টাকা দিতে ৫ মাস সময় চান।
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা চাই বিদেশি কোম্পানি এ দেশে নিয়মকানুন মেনে ব্যবসা করুক। তিন মাস সময় দিচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর হয়ে যাবে।
বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে তারা নিরীক্ষা আপত্তির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পায়। টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানকে লাইলেন্স বাতিলের হুমকি দিয়ে গত বছরের ২ এপ্রিল নোটিস দেয় বিটিআরসি। গ্রামীণফোন এ বিষয়ে সালিসি নিষ্পত্তির প্রস্তাব করলে সেটি নাকচ করে বিটিআরসি। এরপর বিটিআরসির পাওনার বিষয়ে গত বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে ঢাকার সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে স্বত্বের মামলার (টাইটেল স্যুট) আবেদন করে গ্রামীণফোন। সেই আবেদনটি গৃহীত হয়ে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওই আবেদনের অধীনে বিটিআরসির পাওনা আদায়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হলে গত ২৮ আগস্ট নিম্ন আদালতে সেটি খারিজ হয়ে যায়। পরে ওই খারিজাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে গ্রামীণফোন। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগে গ্রামীণফোন ও বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মধ্যে দুই দফা বৈঠক হলেও তাতে সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।