এনু-রুপনের আস্তানা থেকে নগদ ২৭ কোটি টাকা উদ্ধার

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়ার আরেক বাসায় অভিযান চালিয়ে পাঁচটি সিন্দুকে এবার ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা পেয়েছে র‌্যাব। সেই সঙ্গে সোয়া পাঁচ কোটি টাকার এফডিআরের নথি, ১ কেজি সোনার গহনা, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। এর আগে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর গেণ্ডারিয়া, ওয়ারী এবং সূত্রাপুরে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব এনু-রুপনের বাসা থেকে ৫ কোটি ৫ লাখ ৯৪২ হাজার ১০০ টাকা ও সাড়ে ৮ কেজি সোনা উদ্ধার করেছিল। র‌্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যাসিনো কারবারে জড়িত এই দুই ভাইয়ের আরও কয়েকটি সিন্দুক থাকার তথ্য মিলেছে। সেগুলোর খোঁজে তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।

এনু-রুপনের বাসায় র‌্যাবের প্রথম দফা অভিযানের পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে ‘হদিস নেই ৩২ সিন্দুকের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বংশালের ইংলিশ রোডের ‘শাবনাজ স্টিল কোং’ থেকে বিশেষ ফরমায়েশ দিয়ে ওই সিন্দুকগুলো তৈরির কথা বলা হয়। এরপর গতকাল মঙ্গলবার এনু-রুপন ভাইদের আরও পাঁচটি সিন্দুক উদ্ধারের কথা জানিয়েছে র‌্যাব।

গত সেপ্টেম্বরে ওই অভিযানের পর আত্মগোপনে চলে যান ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের অংশীদার এনু-রুপন। গত ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় এক কর্মচারীর বাড়ি থেকে নগদ ৪০ লাখ টাকা ও বেশ কয়েকটি বাড়ির দলিলসহ সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হন তারা। অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় প্রথমে ওয়ান-টেন ও পরে ক্যাসিনো চালুর নেপথ্যে ছিলেন এনু-রুপন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক শীর্ষ নেতাকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের থানা কমিটিতে পদ বাগিয়েছিলেন তারা। এনু গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও রুপন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

গত সোমবার মধ্যরাত থেকে পুরান ঢাকার লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১ হোল্ডিংয়ে মমতাজ ভিলা নামে ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় অভিযানে অংশ নেওয়া র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেখানে টাকাভর্তি পাঁচটি সিন্দুক মেলে। মেশিন এনে টাকা গোনা শেষ করতে মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এনু-রুপনের কেনা ৩২ সিন্দুকের হদিস মিলেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। কোনো সন্ধান পেলেই জানানো হবে।’

এনু-রুপনের টাকাভর্তি সিন্দুক পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গতকাল দুপুরে র‌্যাব-৩ অধিনায়ক রাকিবুল হাসান বলেন, ওই বাড়ির নিচতলার ওই বাসায় পাঁচটি সিন্দুকে ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা এবং ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। এছাড়া ৯ হাজার ২০০ ইউএস ডলার, ১৭৪ মালয়েশিয়ান রিংগিত, ৩৫০ ভারতীয় রুপি, ১ হাজার ৫৯৫ চায়নিজ ইউয়ান, ১১ হাজার ৫৬০ থাই বাথ ও ১০০ দিরহাম এবং বিভিন্ন ধরনের সোনার গহনা পাওয়া গেছে প্রায় এক কেজি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে বাসায় অপারেশন পরিচালনা করেছি, সেই ছয়তলা ভবনটি এনু-রুপনের বাড়ি। ভবনের নিচতলার বাসাটি খুব ছোট আকারের। এখানে মাত্র একটি চৌকি আছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বাসায় টাকা রেখে কেউ পাহারায় থাকতেন। তবে এখান থেকে কাউকে আটক করা যায়নি।’

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, ‘আমরা এখন এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেব। এসব দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার থানায় হস্তান্তর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হবে।’ এসব টাকা ও স্বর্ণালংকার কোথা থেকে এলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে ছিল, গন্তব্য কোথায় ছিল তার সবই তদন্তের আওতায় আনা হবে।’ প্রথম দফায় দুই ভাইয়ের বাসায় অভিযানের পর এসব মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার এ বাসায় আনা হয়েছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে রাকিবুল হাসান বলেন, ‘সম্পূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এ বাসায় অভিযান পরিচালনা করেছি।’

র‌্যাব-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়জুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এনু-রুপন ভাইদের ২৪টি বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে পুরান ঢাকার এ বাড়িটির খোঁজ পান তারা। এরপরই এখানে অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে এনু-রুপনের বাসায় অভিযানের পর তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে  মামলা হয়। পরে জানুয়ারিতে সিআইডির হাতে গ্রেপ্তারের পর প্রথম দফায় চার দিন ও দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ড শেষে তারা এখন কারাগারে রয়েছেন। সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিমান্ডে এনু-রূপন ঢাকায় ১২১টি ফ্ল্যাট, ১২ প্লটে ৭২ কাঠা জমি এবং পাঁচটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য দিয়েছিল। আর তাদের এই অর্থের উৎস ছিল ক্যাসিনো কারবার।

তারা আরও জানিয়েছেন, দুই ভাই জানিয়েছে ওয়ারীর ৭০ নম্বর দক্ষিণ মৈসুন্দির সাততলা ভবনে ১৪টি ফ্ল্যাট, গেণ্ডারিয়ার ৬৫/২, শাহ সাহেব লেনে ১০ তলা ভবনে ১৭টি ফ্ল্যাট, একই লেনের (৭০ বা ৭১ নম্বর হোল্ডিং) ছয়তলা ভবনে রুপনের আছে চারটি ফ্ল্যাট। একই লেনের ৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে একটি চারতলা বাড়িতে ১৩টি ফ্ল্যাটের মালিক এনু। এছাড়া গেণ্ডারিয়ার ১ নম্বর নারিন্দা লেনের চারতলা ভবনে তাদের পাঁচটি ফ্ল্যাট, ১৫ নম্বর নারিন্দা লেনের ছয়তলা বাড়িতে ১১টি ফ্ল্যাট, ছয় নম্বর গুরুদাস লেনের ছয়তলা বাড়িতে ১২টি ফ্ল্যাট, গেণ্ডারিয়ার ১৩৫ নম্বর ডিস্টিলারি রোডে একটি টিনশেড বাড়ি আছে তাদের।

সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়ারী থানার পেছনে ৪৪/বি ব্রজহরি শাহ স্ট্রিটে ৪ কাঠার একটি প্লট, ৮৮ মুরগিটোলায় ৯ কাঠার প্লট, কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকায় ১৫ কাঠা জমির ওপর একতলা তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট এবং মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ কাঠার একটি প্লট আছে দুই ভাইয়ের। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানায়, পুরান ঢাকার ২৯ নম্বর বানিয়ানগরে রূপন স্টিল হাউস, বংশালের ১৪ নম্বর নবাব ইউসুফ রোডে এনু-রূপন স্টিল হাউস, একই রোডে একটি দোকান, ধোলাইখালে বাঁধন এন্টারপ্রাইজ এবং ২৯ নম্বর বানিয়ানগরে সুমন শিট কাটিং নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের।

তারা আরও জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে দুই ভাই ১০৩ লালমোহন স্ট্রিটের পাশে আধা কাঠা খালি জমি, ১১৯ লালমোহন স্ট্রিটে আধা কাঠা জমিসহ ছয় তলায় একটি ফ্ল্যাট, শরীয়তপুরের নাড়িয়ায় ১২ শতাংশ জমি, পালংয়ের দোশমা গ্রামে ৩৪ শতাংশ জমি, রাজধানীর নারিন্দার ১৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে তিনটি ফ্ল্যাট, ৬৫ নম্বর শাহ সাহেব লেনে একটি টিনশেড বাড়ি এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ‘জাহিদ ডায়েমের’ মাধ্যমে দুটি বাড়ি নির্মাণাধীন থাকার তথ্য দিয়েছে।