কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ সম্মেলন

ব্যাংক বন্ধ হলে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের তথ্য গুজব

কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখার পর সেটি বন্ধ বা অবসায়ন হয়ে গেলে আমানতকারী মাত্র ১ লাখ টাকা ফেরত পাবেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সঠিক নয় উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছেএটি পুরোপুরি গুজব। নতুন যে আমানত সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে, তাতে আমানতকারী কোনো ব্যাংক বন্ধ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ওই আমানতের বিপরীতে ব্যাংকের করা বীমা সুবিধা হিসেবে ১ লাখ টাকা পাবেন। আর আমানতকারী ওই ব্যাংকে যে টাকা আমানত রেখেছেন, তার পুরোটাই বিদ্যমান অন্যান্য আইন অনুযায়ী ব্যাংকের সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীকে ফেরত দেওয়া হবে। তাই এ বিষয়ে গ্রাহকদের শঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।

ব্যাংক অবসায়ন বা বন্ধ হলে আমানতকারী মাত্র ১ লাখ টাকা ফেরত পাবেন উল্লেখ করে সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেলার চিন্তা মাথায় আনেন। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের আমানতকারীরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এ প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনো ব্যাংক অবসায়ন হওয়ার সুযোগ নেই। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না। তা সত্ত্বেও যদি কখনো কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েই যায়, সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা ব্যক্তিদের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ লাখ টাকা করে বুঝিয়ে দেবে। এই ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম ৯০ দিন আমানতকারীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হবে। পরের ৯০ দিনের মধ্যে ওই ১ লাখ টাকা করে আমানতকারীকে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে আমানতকারী আইন অনুযায়ী তার আমানতের পুরো টাকাই ফেরত পাবেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিলে ৮ হাজার ৭৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা জমা হয়েছে। কোনো ব্যাংক বন্ধ হলে আমানতকারীদের প্রথম তিন মাসের মধ্যে ১ লাখ টাকা করে পরিশোধ করা হবে। আর এই ১ লাখ টাকা করে পরিশোধ করলে ৯২ শতাংশ আমানতকারীর টাকা পরিশোধ হয়ে যাবে। এই টাকার পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

সিরাজুল ইসলাম আরও জানান, এর আগে শুধু ব্যাংকের আমানতকারীরা বীমা সুবিধা পেতেন। এখন নতুন করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদেরও এখানে যুক্ত করা হয়েছে। এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব আমানতকারী এই সুবিধা পাবেন।

তিনি বলেন, প্রথমে ব্যক্তি গ্রাহকের টাকা এবং পর্যায়ক্রমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। সবশেষে টাকা পাবেন প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আর কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মুখপাত্র।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাত্র ৮ শতাংশ আমানতকারীর হিসাব বীমাকৃত নয়, অর্থাৎ ৮ শতাংশ আমানতকারী ঝুঁকিতে আছেন। এছাড়া বাকি ৯২ শতাংশ আমানতকারীর হিসাব সম্পূর্ণ বীমাকৃত।

তিনি বলেন, ১৯৮৪ সালে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় যে আইন করা হয় সেখানে আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিমাণ ছিল ৬০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে ২০০০ সালে আমানত বীমা আইন প্রবর্তন করে ১ লাখ টাকা করা হয়। বর্তমানে এই আইনে আমানতকারীদের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে। তবে সংশোধিত আইনে এটি বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোনো ব্যাংক অবসায়নের ঘোষণা দিলে অনধিক ১৮০ দিনের মধ্যে আমানতকারীদেরকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল’ থেকে পরিশোধ করা হবে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমানত সুরক্ষা ট্রাস্ট তহবিলের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারি ট্রেজারি বন্ড খাতে বিনিয়োগ করে। সেখান থেকে পাওয়া মুনাফা ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর দেওয়া প্রিমিয়ামের মাধ্যমে তহবিলের অর্থ উত্তরোত্তর বাড়ছে। ভবিষ্যতে শুধু এই তহবিল হতেই শতভাগ আমানতকারীর আমানত বীমার আওতায় আসবে বলে আশা করা যায়।

তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের পাশাপাশি আমানত বীমা আইন বাংলাদেশ সরকারের একটি পৃথক নিরাপত্তা বলয়। অর্থাৎ আমানতকারীদের বীমাকৃত অর্থ দেওয়ার পৃথক ব্যবস্থা, যা আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা নিশ্চিত করে।