ফের পতনবৃত্তে পুঁজিবাজার

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল গঠনে সাময়িক ঊর্ধ্বগতির পর ফের পতনবৃত্তে পড়েছে পুঁজিবাজার। ব্যাংকসহ বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের দরপতনে টানা পাঁচ কার্যদিবস সূচক কমেছে। এ সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচকটি হারিয়েছে ২০৯ পয়েন্ট। এর মধ্যে গতকাল সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৬৩ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচকটি কমেছে ৭২ পয়েন্ট।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত পাঁচ কার্যদিবস ধরে ধারাবাহিকভাবে সূচক পতনের হার বাড়ছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি ডিএসইএক্স ২২ পয়েন্ট, ২৩ ফেব্রুয়ারি ৩৪ পয়েন্ট, ২৪ ফেব্রুয়ারি ৪৮ পয়েন্ট ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ২৯ পয়েন্ট হারায়। আর গতকাল এ সূচকটি ৭২ পয়েন্ট হারায়। মূলত ব্যাংক, এনবিএফআই ও বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের পতনই সূচক কমাতে ভূমিকা রাখছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা আগামী ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটি কার্যকর হলে ব্যাংকের নিট মুনাফা তলানিতে নেমে আসবে। তহবিল ব্যয়ের তুলনায় ব্যাংকঋণের সুদহার তুলনামূলক কম হওয়ায় কোনো কোনো ব্যাংক পড়বে লোকসানে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের গতিও কমে যাবে। এর ফলে ব্যাংকের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতও মূলধন সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতের এই সংকটই পুঁজিবাজারে পড়তে শুরু করেছে।

পুঁজিবাজারের শীর্ষ মূলধনী খাত ও সবচেয়ে বেশি ফ্রি-ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ার থাকায় সূচকে ব্যাংক খাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক দরপতনে এ খাতটির প্রভাবই বেশি। গত পাঁচ কার্যদিবসে এ খাতটির সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংক প্রায় ২০ শতাংশ দর হারিয়েছে। এ সময় ব্যাংক এশিয়া, সিটি, ইস্টার্ন, প্রিমিয়ারসহ অন্যান্য ব্যাংকের শেয়ারের দরও কমেছে। গতকাল পুরো খাতটি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। আর গত পাঁচ কার্যদিবসে খাতটির দর কমেছে সাড়ে ৭ শতাংশ। এছাড়া অর্থ আত্মসাৎ ও খেলাপি সংকটের কারণে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। ফলে এ খাতটি নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে।

ব্যাংক খাতের বাইরে গ্রামীণফোনের ইস্যুটিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিটিআরসিকে আপাতত দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা গ্রামীণফোনের শেয়ারের দর কমাচ্ছে বলে বাজার সূত্রে জানা গেছে। যদিও আদালতের আদেশের আগে শেয়ারটির দর বেড়েছিল। একক কোম্পানি হিসেবে সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব গ্রামীণফোনের। এছাড়া বিএটি বাংলাদেশ, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, লাফার্জহোলসিম, সামিট পাওয়ার, বিএসআরএম লিমিটেড, বিএসআরএম স্টিল ও অলিম্পিকসহ       অন্যান্য বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর দরপতন সূচকের পতন ত্বরান্বিত করছে। করোনাভাইরাসের কারণে চীন থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদনশীল খাতও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা পুঁজিবাজারের উৎপানশীল খাতের কোম্পানিগুলোর আয় কমিয়ে দিতে পারে।

এদিকে সূচকের টানা পতনের মধ্যে ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকা থেকে নেমে ৬০০ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইর দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ৬০০ থেকে ৭৭০ কোটি টাকায় ওঠানামা করছে। ব্যাংক খাতের আমানতে সুদহার কমে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে লেনদেন বাড়ার আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। গত দুই সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন শতভাগ বাড়তে দেখা গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হওয়ায় লেনদেনে গতি এসেছে।

খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়বস্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, কাগজ ও প্রকাশনা খাত ছাড়া গতকাল সবগুলো খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে সিরামিক খাতের শেয়ার দর। গতকাল এ খাতটি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। এছাড়া পাট ৫ দশমিক ১ শতাংশ, ব্যাংক ২ দশমিক ৭ শতাংশ, এনবিএফআই ও সিমেন্ট ২ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর বাইরে বীমা, জ¦ালানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ ও খাদ্য খাতের শেয়ার দর ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

একক কোম্পানি হিসেবে গতকাল সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, নর্দার্ন জুট, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, আরএকে সিরামিক, জিলবাংলা সুগার মিলস, ব্যাংক এশিয়া, এফএএস ফাইন্যান্স, সায়হাম টেক্সটাইল ও এস্কয়ার নিট কম্পোজিটের শেয়ার।