টকশোতে পুলিশ আর সামিরার বাবাকে চান সালমানের মামা

জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশ সর্বশেষ যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে তার মামা আলমগীর কুমকুম বলেছেন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার পেছনে তৎকালীন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন।

গত বুধবার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, তৎকালীন ডিবি ডিসিসহ পুলিশের আরও তিনজন কর্মকর্তা মামলাটি প্রথম থেকেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছিলেন। এজন্যই আজ এ পরিস্থিতি। আমাকে আপনারা টেলিভিশনের সামনে গোলটেবিলে বসান। আমি প্রশ্ন ছুড়ে দেব, উত্তর দেওয়ার কেউ থাকলে আসুক। পিবিআই-এর বড় সাহেব আসুক, সেই সময়কার পুলিশ কর্মকর্তারা আসুক। সামিরার (সালমানের স্ত্রী) বাপ আসুক। তারা আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিক।’

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ১৪ তলা বিলাসবহুল ভবন ‘ইস্কাটন প্লাজা’র ১১/বি ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথম থেকেই সালমানের পরিবার এটিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে আসছে।

গত সোমবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলন করে জানান, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, সে আত্মহত্যা করেছে। এর পেছনে নায়িকা শাবনূরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা থেকে সৃষ্ট পারিবারিক কলহসহ ৫টি কারণ রয়েছে। গত মঙ্গলবার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই।

সালমান শাহর মামা আলমগীর দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে পিবিআই-এর ওই তদন্ত প্রতিবেদন ফলাও করে প্রকাশ করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে দ্রুতই আদালতে নারাজি জানানো হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারের মালিক জজ। তারা মনগড়া প্রতিবেদন দিলেই হবে না। পিবিআই ফলাও করে প্রতিবেদন প্রকাশ করল। এই তদন্ত প্রতিবেদনে অনেক অসংগতি আছে। কাজের মেয়ে ডলি, মনোয়ারার দুই রকম স্টেটমেন্ট রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সালমান শাহের সিলেটে হওয়া দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তার ঘাড়ের স্পাইনাল কড (ইনটেক) অক্ষত রয়েছে। ফাঁসি লাগলে সেটি ইনটেক থাকার কথা না। ঢাকার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মাথার খুলি কেটে মগজ নেওয়া হয়নি। পরে সিলেটে ময়নাতদন্তের সময় নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় ময়নাতদন্তকারী ডোমও বলেছে এটি হত্যাকাণ্ড। এগুলো আপনারাই যাচাই করে দেখেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখতে চাইলে কেউ দেখাতে পারবে না।’

তবে পিবিআই বলছে, তারা তদন্ত নিয়ে শতভাগ সন্তুষ্ট। দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে ৪৪ সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছে সালমান শাহ আত্মহত্যাই করেছে। ঘটনাটি ২৪ বছর আগের হওয়াতে কোনো তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

এই মৃত্যুর পেছনে বাংলা চলচ্চিত্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হাত ছিল বলে সালমানের মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ। তবে তাকে কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। সালমানের লেখা সুইসাইড নোটে তার কোনো স্বাক্ষর না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল পরিবার। মৃত্যুর পর বিভিন্ন সংস্থার করা নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফ্ল্যাট থেকে দুটি ছোট বোতলে (ভায়েল) ভরা তরল পাওয়া যায়। সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষক মুহাম্মদ আবদুল বাকী মিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই বর্ণহীন তরলে ‘লিগনোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড’ পাওয়া গেছে, চিকিৎসকরা যেটি লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার (স্থানীয় চেতনানাশক) কাজে ব্যবহার করেন। সালমানের মৃত্যুর বিষয়ে চারটি সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে কোনোটিতেই এই রাসায়নিকের ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর ইন্সপেক্টর তরিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি লোকাল এনেস্থেসিয়া। এটি দিয়ে কাউকে মারা যায় না। এই বিষয়টিতে একটু অস্পষ্টতা আছে। প্রথম দিন ঘটনার পরে পুলিশ যখন ঘটনাস্থল থেকে চিরকুট ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করল তখন তারা চেতনানাশক পায়নি। এর পরে ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে চাবি সালমানের মা নীলা চৌধুরী নিয়ে যান। এর সাত দিন পরে সালমান শাহের পাশের ফ্ল্যাটের সালমান মহসিনের স্ত্রী ইজ্জেতুননেসা সুইটি (যার সঙ্গে সামিরার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল) ফোন করে সামিরাকে জানান, তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়মিত বাসায় আসা-যাওয়া করছেন এবং জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি সামিরা তার বাবা শফিকুল হক হীরাকে জানান। পরে তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানালে পুলিশ বাসাটি সিলগালা করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ওই বাসা থেকে চেতনানাশক পায়। ফলে বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা আছে।

আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ব্যাপারে ইন্সপেক্টর তরিকুল বলেন, ‘আমাদের তদন্তে যে যে জিনিসগুলো আসছে সেখানে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিষয়টি আসেনি। মামলায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের প্রসঙ্গ আসার সূত্রটি হচ্ছে, ক্যান্টনমেন্ট থানায় যে মামলাটি হয়েছিল সেই মামলায় রেজভী আহম্মেদ ফরহাদ নামের একজন জবানবন্দি দিয়েছিলেন সেখানে তিনি বলেছিলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই সহকারে ১১ জন লোক সালমান শাহকে হত্যা করেছে। পরবর্তী সময়ে তিনি আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বলেন, আমাকে দিয়ে যা বলানো হয়েছিল এ বিষয়টি সঠিক নয়, আমি কিছুই জানি না।’ পিবিআই-এর বিশেষ পুলিশ সুপার বশির আহমেদ জানান, সালমান শাহের মায়ের যে বিষয়গুলোতে সন্দেহ ছিল, তিনি যে বিষয়গুলো জানতে চেয়েছিলেন সেগুলোর প্রত্যেকটির তথ্য সংগ্রহ এবং জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। তদন্তে কোনো তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।   

বশির আহমেদ বলেন, ‘মামলার বাদীর সন্তুষ্টি তার বিষয়। এটি আমরা বলতে পারব না। আমাদের তদন্তের বিষয় হচ্ছে সত্য জিনিসটাকে প্রকাশ করা। সেটা কারও পক্ষেও যেতে পারে কারও বিপক্ষেও যেতে পারে। তদন্ত নিয়ে আমাদের দিক থেকে শতভাগ সন্তুষ্ট। আমরা সব দিক থেকেই চেষ্টা করেছি। একটি মামলা ১০ থেকে ১৫ বছরের পুরনো হয়ে গেলে তার সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া, আলামতগুলো পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। যেহেতু এই মামলাটি ২৫ বছর হয়ে গেছে সেই কারণে আমাদের জন্যও ডিফিকাল্ট (কঠিন)। অনেকেই মারা গেছেন। আমরা চেষ্টা করেছি যতগুলো দিক সম্ভব, সাক্ষীদের বারবার ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। সেজন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব ছিল আমরা চেষ্টা করেছি।’