সহিংসতার চিহ্ন দিল্লিজুড়ে

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া সহিংসতা থেমেছে। টানা পাঁচ দিনের সংঘাতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যুর পর বন্ধ হয়েছে সাম্প্রদায়িক রূপ নেওয়া সহিংসতাও। তবে গতকাল শুক্রবারও আহতদের মধ্যে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ ওই সংঘর্ষে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ জনে। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, দিল্লির সংঘাত কমলেও সেখানকার সাম্প্রদায়িক বন্ধনে যে ফাটল ধরিয়ে গেছে তার প্রভাব থাকবে আরও দীর্ঘ সময়। দাঙ্গাবাজরা মানুষকে না তাড়ালেও আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না শহরটির উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের।

টাইমস অব ইন্ডিয়া গতকাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারই বদল হয়েছে শহরটির পুলিশের কমিশনার। গুরুগ্রামে জারি হয়েছে হাই অ্যালার্ট। এছাড়া সহিংসতা তদন্তে দুটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে।

গত রবিবার রাজধানী দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমর্থক ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি মিছিল থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার রূপ নেয়।

গত রবিবার ঘটনার পরই অ্যালার্ট জারি হয়েছিল গুরুগ্রামে। তবে এবার শুক্রবারের জুমার নামাজের আগে নিরাপত্তার লক্ষ্যে সেই অ্যালার্টই আরও কঠোর করা হয়েছে। এদিন অবশ্য দোকান-বাজার কিছুক্ষণ খোলা রাখার জন্য কোথাও কোথাও কারফিউ কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হয়েছে। তারপর ফের জারি হবে কারফিউ।

সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৮টি এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। সিএএ বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় কারা কারা জড়িত, কারা অর্থ জোগাচ্ছে, তা খুঁজে বের করার জন্য দিল্লি হাইকোর্ট শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি সরকার ও দিল্লি পুলিশকে নোটিস দিয়েছে। ঘটনার তদন্ত শুরু ও তা এগিয়ে নেওয়ার জন্য এসব তথ্য প্রয়োজন। আগামী ৩০ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন কেন্দ্র, দিল্লি সরকার ও দিল্লি পুলিশকে এ ব্যাপারে জানাতে বলেছে হাইকোর্ট। ওদিকে দিল্লিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কমিশনার বদল করা হয়েছে। দিল্লির নতুন পুলিশ কমিশনার হচ্ছেন এস এন শ্রীবাস্তব।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, গত ৩৬ ঘণ্টায় দিল্লির কোথাও বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। মানুষের উচিত হবে গুজবে কান না দেওয়া এবং যে দুষ্কৃতরা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে চাইছে তাদের ফাঁদে পা না দেওয়া।

রবিবার থেকে ছড়িয়ে পড়া অশান্তিতে টানা কয়েক দিন পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। ১৪৪ ধারা অমান্য করে লোকজন রাস্তায় বন্দুক, লোহার রড, লাঠি হাতে নেমে আসে। পরিস্থিতি ক্রমশই খারাপ হয়েছে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বহু বাড়ি ও দোকানে। উন্মত্ত জনতার হাতে প্রাণ ঝরে গেছে অনেক। ভাঙচুর হয়েছে গাড়িও।

বুধবার রাতেও মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর-পূর্ব দিল্লির ভজনপুরা, মৌজপুর ও কারাওয়াল নগরে অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল উত্তর-পূর্ব দিল্লির সহিংসতাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ‘সরকার শান্তি ফিরিয়ে আনবে’, ব্যক্তিগতভাবে এমন আশ্বাস দিয়ে গেলেও শান্তি ফিরে আসেনি।

অগ্নিসংযোগের খবর আসে ভজনপুরা, মৌজপুর ও কারাওয়াল নগর এলাকাগুলোতে। জোহরাপুরী-ভজনপুরায় বুধবার নতুন করে দাঙ্গা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ লাগোয়া জোহরাপুরীতে পুলিশের সঙ্গেও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। গভীর রাতে ব্রহ্মপুরী ও মুস্তাফাবাদ থেকেও অশান্তির খবর আসে।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল মুসলিমদের ওপর এসিড হামলা। মুস্তাফাবাদ এলাকায় বৃহস্পতিবার বেশ কিছু আহত হাসপাতালে ভর্তি হন, যাদের অনেকের চোখে এসিড ঢালা হয়েছিল। দৃষ্টি হারান চারজন। খুরশিদ নামে একজনের দু’চোখই নষ্ট হয়। দুই চোখসহ পুরো মুখ ঝলসে যায় ওয়াকিল নামে আরেকজনের।

এনডিটিভি জানায়, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিবিড়ভাবে দিল্লি পরিস্থিতি নজরে রেখেছেন। বিক্ষোভকারীদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংযত থাকা উচিত এ বিষয়টির ওপরই গুতেরেস জোর দিয়েছেন। সেই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শান্ত পরিবেশ এবং স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলেও গুতেরেস মত দেন।

বুধবার দিল্লির বিধানসভায় দেওয়া এক বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন ‘সহিংসতায় হিন্দু বা মুসলিম, কারও লাভ হবে না। দিল্লির সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে লোকজন সবাই মিলেমিশে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে অথবা তারা একে অপরকে আঘাত করে হত্যা করতে পারে।’

দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর তীব্র সমালোচনা করেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শাহর পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সোনিয়া দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালেরও সমালোচনা করেছেন। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লির সরকার উভয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।