ঢাকার বায়ুদূষণ কবে বন্ধ হবে

বায়ুদূষণের তালিকায় ২০১৮ সালের মতো ২০১৯ সালেও বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউ এয়ার’ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্বের বায়ু মান প্রতিবেদন-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে। ২০১৯ সালে বিশ্বের ৯৮টি দেশের সার্বক্ষণিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বাতাসের প্রতি ঘনমিটারে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর পরিমাণ হিসাব করে এ তালিকা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত বছর বাংলাদেশে বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ছিল ৮৩.৩। এর আগের বছর যা ছিল ৯৭.১।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্র ১০ পর্যন্ত থাকাটা সহনীয় বলে বিবেচনা করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর ভারত ও চীনে বায়ুদূষণ কমেছে যথাক্রমে ২০ ও ৯ শতাংশ। কিন্তু তারপরও এ দুটি দেশের বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাম্য মানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খারাপ। এ তালিকায় ৮৩.৩ পয়েন্ট নিয়ে সবচেয়ে দূষিত দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ৬৫.৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান। এরপর রয়েছে মঙ্গোলিয়া, আফগানিস্তান ও প্রতিবেশী ভারতের নাম। দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে ভারত পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় সবার ওপরে দিল্লি। অঞ্চল হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার। এ অঞ্চলের ৬৫৫টি শহরের মধ্যে মাত্র ছয়টি শহরের বায়ু মানসম্মত অবস্থানে রয়েছে। ২০১৯ সালের সবচেয়ে দূষিত ৩০ শহরের ২১টি শহরের অবস্থান ভারতে। আর বাকি শহরগুলোর অবস্থানও এশিয়ায়।

বর্তমান বিশ্বে নিরাপদ বায়ুর নিশ্চয়তা খুবই জরুরি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বে প্রতি বছর বায়ুদূষণ এবং বায়ুদূষণের প্রভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। অনুন্নত দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কমবয়সী ৯৮% শিশু দূষিত বায়ুর মধ্যে বেড়ে ওঠে। ফলে বিশ্বে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ। এর প্রভাবে প্রতি বছর ছয় লাখ শিশু মারা যায় বলে জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ঢাকা শহরের ছয়টি বিদ্যালয়ের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা নিয়ে ২০১৬ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরবান ল্যাব। ফলাফলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না। তাদের ফুসফুস ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ করছে।

কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক ওপরে রয়েছে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, বায়ুতে থাকা সিসা মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর একটা বিষয়। সিসার উপস্থিতির প্রভাবে মানুষ দ্রুত বুড়িয়ে যায়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে শিশুরা দুর্বল বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এছাড়া বায়ুতে থাকা ক্ষতিকর বস্তুকণা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুস শক্ত হয়ে অক্সিজেনের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে ক্যানসারসহ নানা রোগ জন্ম নেয়। বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূক্ষ্ম এ বস্তুকণা স্বল্পমেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী বলে জানান চিকিৎসকরা। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যানসার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা। আইকিউএয়ারের প্রতিবেদনও বলছে, অপরিণত বয়সে বছরে সাত লাখ মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণ। বর্তমান বিশ্বে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ এ বায়ুদূষণ।

একটি গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য ইটভাটা দায়ী, ১৮ শতাংশের জন্য দায়ী রোড ডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট, ১০ শতাংশের জন্য যানবাহনের পোড়া ধোঁয়া এবং ৮ শতাংশের জন্য দায়ী বায়োমাস পোড়ানো। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ কারণে শুধু ঢাকাতেই এক বছরে ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশের শহরাঞ্চলে মারা গেছে ৮০ হাজার। পরিবেশ দূষণের সমন্বিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনের ওপর। বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৭ ভাগ। পরিবেশ দূষণে সবচেয়ে ক্ষতিগস্ত হচ্ছে শিশু, রোগী আর বৃদ্ধরা। শুধু বায়ুদূষণে ক্ষতি হয় বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা। ঢাকা শহরের ছয় লাখ মানুষ এখন সিসাদূষণের কবলে। ঢাকার পরই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার।

ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বায়ুদূষণ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঢাকার আশপাশে ফসলের জমি দখল করে অবৈধভাবে শত শত ইটের ভাটা গড়ে উঠেছে। যার বেশির ভাগেরই বৈধ ড্রাম চিমনি নেই। সালফারের মান যাচাই না করেই এসব ইটের ভাটায় নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করছে। পাশাপাশি কাঠ, টায়ার, প্লাস্টিক ইত্যাদি ক্ষতিকারক জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত হচ্ছে ধোঁয়া, ধূলিকণাসহ বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতবকণা। নির্গত হচ্ছে মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক সালফার ও নাইট্রোজেনযুক্ত অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড, ব্ল্যাক-কার্বনসহ অন্য ক্ষতিকর উপাদান যা মানুষের চোখ, ফুসফুস ও শ্বাসনালির মারাত্মক ক্ষতিসহ স্বল্পসময়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী অতিরিক্ত যানবাহন। ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। নগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহন/ব্যক্তিগত অনেক গাড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফিটনেসবিহীন এসব গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। এছাড়া গাড়িতে ব্যবহারকারী ভেজাল ও নিম্নমানের জ্বালানিও দায়ী বায়ুদূষণে। অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং রাস্তাঘাট উন্নয়ন, মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। এসব উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা, বিষাক্ত ক্ষতিকারক গ্যাস ও ভারী ধাতবকণা বাতাসে মিশে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অচিরেই বায়ুদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। বায়ুদূষণের সঙ্গে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সর্বোপরি বায়ুদূষণের সব উৎস বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত করতে হবে। ইট প্রস্তুতের ধরন ও আগে-পরের বিষয়/পদ্ধতি নিয়ে আগের ইট প্রস্তুত আইন ২০১৩ রয়েছে। ২০১৮ সালে এ আইন সংশোধনও করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বায়ুদূষণ বা পরিবেশদূষণ রোধকল্পে বেশকিছু আইন-বিধি-নীতিমালা রয়েছে। এসব আইন প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে।

লেখক : উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া