অভিজাত হোটেলে ‘যৌনসেবার নামে ব্ল্যাকমেইলের’ অভিযোগে যুব মহিলা লীগ নেতা শামিমা নূর পাপিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে সরকারের হাইকমান্ড। বিভিন্ন সময়ে নানা অপকর্মে জড়িতদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নির্দেশ পেয়ে কাজও শুরু করে দিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। মাদক ও অস্ত্র কারবার, জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িতদের নতুন করে তালিকা করছে পুলিশ ও র্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থা। পাপিয়ার মতো আর কেউ ‘যৌনসেবার নামে পুরুষদের ব্ল্যাকমেইল’ করছে কি না সে তালিকাও করছে সংস্থাগুলো।
একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়ার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছেঅন্তত ৩০ জন ভিআইপি ব্যক্তি নিয়মিত গুলশানের ওই অভিজাত হোটেলে আসা-যাওয়া করতেন। ইতিমধ্যে তালিকাটি প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। তালিকার মধ্যে ক্যাসিনো কা-ে গ্রেপ্তার হওয়া জিকে বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিকে শামীম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই কর্মকর্তা, ৫ জন আমলা, ৬ জন ব্যবসায়ী, ১০ থেকে ১২ জন সরকারদলীয় নেতার নাম রয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তালিকাভুক্তদের ব্যাপারে আমরা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছি। তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেতা পাপিয়াকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রিমান্ডে টাকা ও নারীর লোভ দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করা, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান ও রাশিয়া থেকে মেয়েদের নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যারা তাকে সাহায্য করেছে সে ব্যাপারেও জানিয়েছেন পাপিয়া ও তার স্বামীসহ গ্রেপ্তার চারজন। মাদক কারবার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার পাপিয়ার দুই সহযোগীকে গতকাল ফের ৫ দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়ার মানি লন্ডারিংয়ের ফাইল এখন সিআইডির হাতে। ফাইলে তার আয়-ব্যয়, অভিজাত হোটেলে বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধ, গাড়ি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার ফার্মগেটের দুটি ফ্ল্যাটের কথাও রয়েছে। এসব নিয়ে র্যাব পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। সুমন র্যাবকে জানিয়েছেন, তিনি ওই ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকেন। তার পক্ষেও কোনো তথ্য দিতে পারেননি সুমন। সিআইডির ওই কর্মকর্তা জানান, সুমন-পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। র্যাব সম্প্রতি তাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে পাপিয়ার নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে দায়ের মানি লন্ডারিংয়ের মামলা তদন্ত করার জন্য বলেছে। সিআইডি প্রাথমিক কাজও শুরু করেছে। খুব শিগগির সবকিছু বেরিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করছে সিআইডি।
পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদকারী একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাপিয়ার কাছ থেকে একে একে অপরাধজগতের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য বের হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেহব্যবসা, অস্ত্র-মাদক ব্যবসা করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। ক্ষমতার শীর্ষে না থেকেও দাপট দেখিয়েছেন। মনোরঞ্জন করে মন জুগিয়েছেন ওপরওয়ালাদের। পাপিয়ার প্রধান ব্যবসাই ছিল এসকর্ট সার্ভিস। এজন্য ৬৪ জেলায়ই আছে পাপিয়ার এজেন্ট। চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানের নারীদের ঢাকায় নিয়ে আসত। তাদের কখনো তার বাসায় আবার কখনো পাঁচ তারকা হোটেলে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করত। সার্বক্ষণিক পাপিয়ার সঙ্গে থাকা তরুণীরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, পাপিয়ার রংমহলে অনেক উচ্চপর্যায়ের মানুষ যেতেন।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২২ ফেব্রুয়ারি পাপিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভুঁইয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে র্যাব নগদ ২৭ কোটি টাকা ও এক কেজি সোনা উদ্ধার করে। এই দুই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। পাপিয়া এতদিন কাদের ছত্রছায়ায় এত দাপট দেখিয়েছে বা কাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল তাদের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গেণ্ডারিয়ার এনু ও রুপনকে কারা প্রশ্রয় দিয়েছে বা কাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে শুদ্ধি অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ওই সময় অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অভিযোগে বেশ কয়েক জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর কয়েক মাস অভিযান দৃশ্যমান থাকেনি। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযান দৃশ্যমান না হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিভিন্নভাবে তথ্য অনুসন্ধান চলছে।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়। এই সুযোগে দলটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের অনেকেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আসছেন। প্রভাব খাটিয়ে অপকর্ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন। অনেকেই দলকে ব্যবহার করে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে পাপিয়াকে গ্রেপ্তার এবং গেণ্ডারিয়ার অভিযান চালানো হয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী অনেক তথ্য দিচ্ছেন। তাদের কখনো আলাদাভাবে, কখনো মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রিমান্ডে তাদের দুই সহযোগী সাব্বির ও তায়্যিবার কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গুলশানের ওই অভিজাত হোটেলে পাপিয়ার কাছে কারা কারা যেতেন তাদের নাম হোটেল কর্র্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি অর্থপাচার, বিদেশি জাল মুদ্রা সংরক্ষণ ও মাদক কারবারের অভিযোগে র্যাব-১ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাপিয়া, তার স্বামী ও দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের নিয়ে ফার্মগেটের বাসায় অভিযান চালিয়ে নগদ ৫৮ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা ও পিস্তল, গুলি ও মদ উদ্ধার করে। এসব ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি এবং শেরেবাংলা নগর থানায় দুটি মামলা করে র্যাব। তিন মামলায় পাপিয়া ও তার স্বামী ১৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। পাপিয়াসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির অপেক্ষায় আছে র্যাব।