বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি আগের চেয়ে বেশি

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। শুরু থেকেই দেশটি ঝুঁকিতে থাকলেও বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাওয়ায় ও প্রতিবেশী ভারতে রোগটি দেখা দেওয়ায় দেশের জন্য ঝুঁকির মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রায়ও রোগটির ভাইরাস টিকে থাকার কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে রোগটির সংক্রমণ যাতে ছড়াতে না পারে সে জন্য সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন নিয়েও আপাতত কোনো আশাবাদ নেই। সুতরাং এই মুহূর্তে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর’বি) পরামর্শক ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ আগে থেকেই রয়েছে। এখন আরও বেড়েছে। ইতিমধ্যেই অর্ধশতাধিক দেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুদিন ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আক্রান্ত দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে গেছে। তাছাড়া প্রতিবেশী ভারতেও রোগটি দেখা দিয়েছে। সুতরাং দিন দিন দেশের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে রোগটির সংক্রমণ যেন না হয়, সে জন্য সরকারকে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীমান্তে বা বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করাই শেষ কথা নয়। কারণ সেখানে কিন্তু শনাক্ত হয় না। শনাক্ত হয় দেশের ভেতর এসে। হাসপাতালে ধরা পড়ে। সুতরাং হাসপাতালগুলোতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানেই আমাদের দুর্বলতা বেশি।

অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সমন্বিত প্ল্যান করতে হবে। তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এখানে রোগটি শনাক্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে। কিন্তু এর ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু না করে সমন্বিতভাবে সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে।

বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রায় করোনাভাইরাস টিকে থাকতে পারায় সব দেশের জন্যই রোগটি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একসময় ভাবা হতো এ ভাইরাসটি উচ্চ তাপমাত্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, সংক্রমণ ছড়াতে পারে না। কিন্তু তা ভুল। গ্রীষ্মকালে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাবে এমন ভরসায় বসে থাকা যাবে না। তাপমাত্রার সঙ্গে করোনাভাইরাসের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, উচ্চ তাপমাত্রা আছে এমন দেশেও করোনা ধরা পড়েছে। ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় টিকতে পারে না এ ভাইরাস। এত তাপমাত্রা কোনো দেশেই নেই।

বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে আইইডিসিআর সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন নিয়েও আপাতত কোনো আশাবাদ নেই। ভারতে নতুন করে আরও দুজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন দেশটির রাজধানী দিল্লিতে অন্যজন দক্ষিণের তেলেঙ্গানায়। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ভারতে মোট পাঁচজন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন আগেই শনাক্ত হয়েছে। নতুন আক্রান্ত হওয়া দুজনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দিল্লিতে চীনের উহান থেকে আসা ২৩ জন বাংলাদেশি দিল্লি শহর থেকে ৪০ মাইল দূরে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

তাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধের ওপরই জোর দিচ্ছে সরকার- জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ভারতের কেরালা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সব স্থলবন্দরে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার ছাড়াও হাতে পরিচালিত স্ক্যানারও দেওয়া আছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ ছাড়াও জনগণের সচেতনতা জরুরি।

ডা. সেব্রিনা জানান, সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত বাংলাদেশির মধ্যে দুজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বাকি তিনজনের অবস্থা অপরিবর্তিত। আমরা এখন পর্যন্ত ৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছি। কারও মধ্যে ভাইরাসের নমুনা পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আজারবাইজান, ইকুয়েডর, আইল্যান্ড, মোনাকো ও কাতারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। নতুন পাঁচটি দেশসহ এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৫৮টি দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

এদিকে দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে গতকাল সোমবার চিঠি পাঠিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কারণ মাঠ প্রশাসন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে রয়েছে। জেলা পর্যায়ে ১১ সদস্যের কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। অপরদিকে, উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যের কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা কমিটিতে এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। জেলা কমিটি করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। উপজেলা কমিটি জেলা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে জাতীয় কমিটির নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। জেলা ও উপজেলা কমিটি করোনাভাইরাস প্রতিরোধের লক্ষ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রয়োজনে কোয়ারেন্টাইনসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ জাতীয় কমিটির পরামর্শ গ্রহণ করবে জেলা-উপজেলা কমিটি।