সম্রাট-খালেদ-জি কে শামীমকে দিয়ে টেন্ডার বাগাতেন পাপিয়া

 ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার জি কে শামীমের সঙ্গে নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেতা শামিমা নূর পাপিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাদের দিয়েই সরকারের বিভিনড়ব দপ্তর থেকে টেন্ডার বাগাতেন তিনি। এ কাজে ব্যবহার করতেন সুন্দরী নারীদেরও। এভাবে সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজউক, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে টেন্ডারবাজি ও তদবিরবাজি চালাতেন ‘যৌনসেবার নামে প্রতারণার’ অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেপ্তার এই যুব মহিলা লীগ নেত্রী।

ক্যাসিনো কারবারিদের পাশাপাশি এসব কাজে তাকে আরও সহায়তা করেছেন বিভিনড়ব রাজনৈতিক দলের নেতারা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী ভয়ংকর ধূর্ত। তারা যেসব তথ্য দিচ্ছেন তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল। ওইসব ব্যক্তি তার ডেরায় নিয়মিত যেতেন। ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, গুলশানের অভিজাত হোটেল ছাড়াও পাপিয়ার আরও কয়েকটি ডেরা রয়েছে। সেগুলো আছে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডসহ কয়েকটি এলাকায়। ওইসব ডেরাতেও ‘ভিআইপিরা’ আসা-যাওয়া করতেন। তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলার একজন রাজনৈতিক নেতা হয়ে পাপিয়া কীভাবে বিলাসি জীবনযাপন করতেন সে রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবকটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা পাপিয়ার আত্মীয়স্বজন, জমিজমা, বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ির খোঁজখবর নিচ্ছে। তার সঙ্গে কার কার সখ্য ও কারা কারা তার ‘পার্টিতে’ যেতেন তাও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকাবাসী ও বিভিনড়ব ভুক্তভোগী। কয়েক বছর ধরে তিনি উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন করছেন। নরসিংদী শহরে নামে-বেনামে তিনি অনেক জায়গা-জমি ক্রয় করেছেন। চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ‘মোটা অঙ্কের’ অর্থ। এ প্রসঙ্গে সিআইডির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়ার অঢেল টাকার উৎস খোঁজা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার অবৈধভাবে টাকা আয়ের তথ্য তারা জেনেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখল, নারীদের দেহ ব্যবসায় বাধ্য করার পর গোপনে ভিডিও ধারণ, পরবর্তী সময়ে জিম্মি করে টাকা আদায়সহ নানা অভিযোগ রয়েছে। নরসিংদীর বিভিনড়ব কলেজের ছাত্রীদের দিয়ে তিনি গুলশানে হোটেল ভাড়া নিয়ে দেহ ব্যবসা চালাতেন।

অভিজাত হোটেলে রুম ভাড়া নেওয়া, অতি উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন, অল্প দিনে ধনী হওয়া, নতুন বাড়ি করা, জমি কেনা এসব বিষয় গোয়েন্দাদের নজরে আসার পর থেকে তদন্ত শুরু হয়। তিন মাস ধরে তার বিরুদ্ধে বিভিনড়ব অভিযোগ এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্রাট, খালেদ ও জি কে শামীমের সঙ্গে ছিল পাপিয়ার গভীর সখ্য। পাপিয়ার ফোনের কললিস্টে এ তিনজনের নাম্বার আছে। তারা গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তার সঙ্গে প্রায়ই দেখা করতেন। হোটেলে জি কে শামীম গেলেও সম্রাট ও খালেদ যেতেন না। তবে তাদের দিয়ে টেন্ডার বাগাতেন পাপিয়া। এজন্য বিভিনড়ব দপ্তরে গেলে সুন্দরীদের নিয়ে যেতেন। ওইসব দপ্তরের কর্মকর্তাদের তরুণীদের দিয়ে টোপে ফেলতেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, শুধু অভিজাত হোটেল নয়, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের রওশনস ডমিনো রিলিভো ভবনের ভাড়া ফ্ল্যাটেও রাতে নিয়মিত ‘আমোদ-ফুর্তির আসর’ বসাতেন পাপিয়া। সেখানে সুন্দরী তরুণী ও ভিআইপিরা আসতেন। তিন বছর ধরে এসব কাজ চলেছে ওই ফ্ল্যাটে। তবে পাপিয়া মাসে ছয়সাত দিনের বেশি অবস্থান করতেন না ওই ভবনের নিজস্ব ফ্ল্যাটে।

মাসে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে তৃতীয় তলার ওই ফ্ল্যাট রেখেছিলেন পাপিয়া। তাছাড়া গুলশানের তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী এলাকায় আরও তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েও ‘যৌন ব্যবসা’ চালান পাপিয়া। যারা ওই অভিজাত হোটেলে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না তাদের যাতায়াত ছিল ওইসব অ্যাপার্টমেন্টে। দেশের কোনো পর্যটন এলাকায় ঘুরতে গিয়ে ‘মনোরঞ্জনের জন্য’ নারী সংগ্রহ করতে চাইলে বাংলাদেশ স্কট সার্ভিসের নম্বরে ফোন দিলেই সেখানে তরুণীদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো। মন্ত্রী-এমপিদের পাশাপাশি আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কাজ ভাগিয়ে নিতেও পাপিয়া ব্যবহার করতেন সুন্দরী তরুণীদের। পাপিয়ার এ অনলাইন সার্ভিস দেখার পর বেশ কয়েকটি ‘দেহ ব্যবসার’ অনলাইন সার্ভিস শুরু হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফার্মগেটের ভবনের এক কেয়ারটেকার জানান, প্রায়ই রাত ১২টা-১টার দিকে সাত-আটজন নারী নিয়ে বাসায় আসতেন পাপিয়া ম্যাডাম। কোনো দিন নিজের গাড়ি নিয়েই আসতেন, আবার কোনো দিন অন্য কেউ এসে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। যেদিন রাতে আসতেন সেদিন রাতে থেকে পরের দিন দুপুরে চলে যেতেন।

মাঝেমধ্যে সঙ্গে অনেক বড় বড় ‘স্যারও’ নিয়ে আসতেন। তারা বেশি সময় থাকতেন না। এক-দুই ঘণ্টা থেকে চলে যেতেন। ম্যাডাম তাদের নিচের পার্কিং পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পাপিয়াসহ গ্রেপ্তার চারজন অধিকাংশ সময় রাজধানীর বিভিনড়ব বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করেছেন। তবে পাপিয়ার স্বামী সুমন চৌধুরী বেশিরভাগ সময় থাইল্যান্ডে থাকতেন। গত থার্টিফার্স্ট নাইটে তিনি রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে ছিলেন। ওই রাতে তার কক্ষেও চার-পাঁচজন সুন্দরী নারী ছিলেন। পাপিয়ার সব কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশীদার তার স্বামী সুমন ।