ব্যয় সংকোচনের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হোক

প্রয়োজনের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি সবখানেই জেঁকে বসেছে। দেশের নানা বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের নিয়মিত নানা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ কথা বলা যেতে পারে যে, এখন কোনো প্রকল্প প্রণয়নের সময়ই বিভিন্ন খাতে কোথায় কতটা অনিয়ম-দুর্নীতি করা যাবে সেই ছক কাটা হয়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী আর প্রকল্প অনুমোদনকারী দপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকেরাও। আর রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার তো আছেই। এসব বিষয়ে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার মন্তব্য করেছেনদুর্নীতি না হলে দেশের চেহারা পাল্টে যেত, ফাঁকফোকর কোথায় এবং কারা উন্নয়ন প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু যাদের এসব ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার কথা, তারা সেই দায়িত্ব পালন করছেন কি? উত্তরটা সহজেই অনুমেয়। তবু আশার কথা এই যে, এখনো এমন ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দেখা যায়, যা অনিয়ম-দুর্নীতির রাশ টেনে ধরার আশা জাগায়।

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘প্রকল্পের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ও বিদেশ ভ্রমণে কাটছাঁট’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনই একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্তের খবর প্রকাশিত হয়। এতে উঠে আসে, গত ১৭ জানুয়ারি মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর দেশ রূপান্তরে ‘সেচ দেখতে বিদেশ যাবেন ২৪ কর্মকর্তা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাবের তথ্য তুলে ধরা হয়। এরপর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় বিদেশ ভ্রমণ ও বিভিন্ন খাতের অতিরিক্ত বরাদ্দ কাটছাঁটের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদেশ সফর খাতে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্প প্রস্তাব অনুসারে ২৪ কর্মকর্তার বদলে এখন বিদেশে যেতে পারবেন ৮ কর্মকর্তা। একই সঙ্গে প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রস্তাব থেকে বিভিন্ন খাতে প্রায় ২৬ কোটি টাকা কাটছাঁটেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের এই নজরদারি ও তৎপরতা অব্যাহত থাকলে তা এমন আরও অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

সম্প্রতি বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে সরকারি কর্মকর্তাদের দলবেঁধে বিদেশ সফরের একের পর এক খবরে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, ‘শিক্ষাসফর’, ‘সরেজমিন পরিদর্শন’সহ নানা নামে নানা ছুতোয় কর্মকর্তাদের এসব বিদেশ সফরের বেশিরভাগই মূলত প্রমোদভ্রমণ। সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলতে থাকে। এসব বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর। প্রতিবেদনের পাশাপাশি গত বছরের ১৮ অক্টোবর ‘দেশের টাকায় বিদেশ সফরের আশ্চর্য রোগ’ এবং গত ২১ জানুয়ারি ‘বিদেশ না দেখে দেশের ভালো দেখুন’ শিরোনামে এসব বিষয়ে দুটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর। মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে আলোচিত প্রতিবেদনটিও ছিল এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের আলোচিত একটি সংবাদ।

‘দায়িত্বশীলদের দৈনিক’ সেøাগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে কিছুদিন আগেই প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করল দেশ রূপান্তর। এরই মধ্যে নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেমন পাঠকদের আস্থা অর্জন করেছে তেমনি তা বেশকিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছে। গত বছরের ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা দিক তুলে ধরা হয়যা পরবর্তী সময়ে ‘রূপপুর বালিশকাণ্ড’ নামে পরিচিতি পায় এবং সমাজে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার মধ্য দিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পরে গত বছরের ২৬ জুলাই ‘জনস্বার্থে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অর্জন’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়তে আমরা বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জনস্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম সে বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। বাস্তবিক অর্থেই গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, বিচার বিভাগের আন্তরিক তাগিদ এবং সরকারের নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা একত্রে মিলিত হলে, জনস্বার্থ রক্ষা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের পথে যে অনেক কিছুই করা সম্ভবএসব তারই দৃষ্টান্ত। সরকার সংবাদমাধ্যমের এমন বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে এমন আরও অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব।