একটি গাছের মা হয়ে ওঠার গল্প

অল্প বয়সে মাকে হারানোর পর ফিলোডেনড্রন নামের গাছটি নিকোলের কাছে মায়ের মতোই হয়ে ওঠে। মায়ের আদর না পাওয়া ছোট্ট নিকোলের জীবনে গাছটি হাজির হয় নতুন মায়া নিয়ে। গাছের রূপে মাকে ফিরে পেলেও সেই গাছও একদিন হারিয়ে যায়। নিকোলের জীবনের সেই গল্প অনুবাদ করেছেন আরফাতুন নাবিলা

নিকোলের জবানি

আমার মায়ের মৃত্যু হয় এপ্রিলের ২০ তারিখে। দিনটি ছিল বুধবার। সে সময়টি ছিল ইস্টার আর আমার অষ্টম জন্মদিনের সময়। খবরটি যখন আমাদের কাছে আসে তখন আমি ভাইয়ের সঙ্গে লিভিং রুমে মারামারি করছিলাম, পুরো কম্বল জুড়ে ছড়ানো ছিল শিমের বিচি। অবশ্য মখমলের সবুজ রঙের সোফা তার জায়গায় ঠিকই ছিল। কারণ সেখানে আমাদের বসার অনুমতি ছিল না। আমাদের বাড়িতে, আরামটুকু তোলা থাকত বড়দের জন্য। আমাদের জন্য ছিল কম্বল। টেলিভিশন দেখার সময় তাতে বসেই কাটত আমাদের অধিকাংশ সময়।

যে রাতে আমরা মায়ের মৃত্যুর খবর পাই সে রাতটিও ছিল অন্যান্য সাধারণ রাতের মতোই। নানাভাই খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তার পাশে রাখা ছিল মধুর রঙের এক ধরনের পানীয়। এই পানীয় আমরা প্রচণ্ড শীত হলে পান করি শীত কমানোর জন্য। পত্রিকার ওপরের ডান পাশের খবর থেকে শুরু করে প্রতিটি খবর তিনি পড়তেন। এই সময়ের মধ্যে নিতান্তই দুঃসংবাদ না পেলে পত্রিকা ছেড়ে তিনি ওঠেন না। প্রতিটি মানুষেরই কোনো না কোনো বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন, চাইলেই টেলিভিশনে দেখানো কোনো লাশ আমরা সাদা কাপড় উঠিয়ে দেখতে পারি না। টিভিতে কয়েকজন মৃত মানুষের নাম দেখাচ্ছিল সে সময়। তাদের নামগুলো আমি খুব ভালো করে উচ্চারণ করতে পারছিলাম না, বারবার মুখে আটকে যাচ্ছিল। তখনই খেয়াল করলাম, আমার ভাই চিটিং করে খেলায় জিততে চাইছে। সেই মুহূর্তেই আমি খেলাটি বন্ধ করে দিয়ে ভাইকে আর জিততে দিলাম না।

নানিমা রান্নাঘরের বিলের হিসাব করছিলেন। তার পেছনে বাজতে থাকা রেডিওর শব্দে ক্যালকুলেটরে হিসাব করার শব্দ ঢেকে যাচ্ছিল। তিনি রেডিওতে সাধারণ অনুষ্ঠান শুনছিলেন। যিশুর একজন ভক্ত ঈশ্বরকে নিয়ে বলছিলেন। কোন কোন বিষয়ে ঈশ্বর নাখোশ হতে পারেন এমন কিছু বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিয়ে কথা বলে শেষ করেন তিনি।

সে সন্ধ্যাতেই গানের মৃদু শব্দ শুনতে শুনতে নানিমা পুরো সপ্তাহের বাজারে কী কী লাগবে তার তালিকা করছিলেন। বহু বছর আগে স্কুলে কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন তিনি। প্যাডের পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সাবধানে হিসাবগুলো সামলে রাখেন তামাটে বর্ণের ব্যাগের ভেতর। প্রতিটি জিনিস, সবখানেই যত্নের ছোঁয়া। রেডিওতে শোনা সেই যিশু বেঁচে রইলেন, ছিঁড়ে রাখা কাগজগুলোও সাবধানে রইল।

ফোনের রিং বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নানিমা গান বন্ধ করে ঘরে পরার জুতো পরে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। আমি শুধু তাকে বলতে শুনলাম, ‘হ্যালো’। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনের রিসিভারটি লম্বা তার ঝুলিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। নানাভাই হাতের পত্রিকা রেখে লাফ দিয়ে তার জায়গা থেকে উঠে নানিমার দিকে ছুটে গেলেন। লিভিং রুমের টিভি থেকে রোনাল্ড রেগানের আওয়াজ যেন গমগম করছিল। নানিমা ভীষণ কাঁদছিলেন। ছোট্ট হলেও বুঝলাম, কিছু একটা হয়েছে যে কারণে তিনি এত কাঁদছেন। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে গেল। আমার নানিমা কখনো কান্না করেন না। এতে তার চোখের মাশকারা নষ্ট হয়ে যায়। কান্নার সময় নানিমাকে দেখতে খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। মুহূর্তেই জীবন কেমন বিপর্যস্ত হয়ে গেল।

আত্মীয়-স্বজনের দেখা মিলল আরও কিছুক্ষণ পর। যখন তাদের অভ্যর্থনা জানাতে দরজা খুললাম, তাদের মাঝে কেউ হয়তো কাঁদছিলেন, আবার কেউবা সান্ত¡না দিচ্ছিলেন। আমার খালা, শিক্ষক সবাই নানাভাবে আমার প্রতি দুঃখ প্রকাশ করছিলেন। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না সবাই কেন এভাবে বলছে। তখন আমি নানাভাইয়ের হাতে বিভিন্ন খাবার তুলে দিচ্ছিলাম। তিনি খাবার ঘরে একের পর এক প্লেট দিচ্ছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, মৃত্যু এমন কী বিষয় যা সবাইকে এত ক্ষুধার্ত করে তুলেছে। আমি হাতে পুতুল নিয়ে লক্ষ করলাম, কেউ আসলে তেমন কিছুই খাচ্ছে না।

অল্প কয়েকজন করে মানুষ একসঙ্গে হয়ে বিভিন্ন কথা বলছিলেন। এক জায়গায় শুনছিলাম, ‘ইস! মেয়েটা এখনো কত ছোট!’ অথবা ‘রোজকে দেখো, এখনো অনেক শক্ত আছে’। নানিমা সবাইকে প্রায় এড়িয়েই চলছিলেন। শুধু কীভাবে মাটি দেওয়া হবে এ বিষয়ে তাকে কথা বলতেই হলো। ঠিক হলো আমাদের স্থানীয় চার্চেই বিদায় অনুষ্ঠান হবে কারণ সেখানে লোকদের দুপুরের খাবার খাওয়ানো হবে। এটি নিশ্চয়ই কোনো নিয়ম যার কারণে নানিমা খুব সিরিয়াসভাবেই কথাগুলো বলছিলেন। তখনই একজন আন্টি বললেন, ‘কিন্তু এর আগে আমাদের এডির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ডেনিসের লাশ বাড়ি আনতে সেই আমাদের সাহায্য করবে।’ এডি আমার মায়ের বন্ধু। কিন্তু নানিমা বললেন, ‘না, আমার মনে হয়, এডি এরইমধ্যে আমাদের জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছে। আমি করোনারের সঙ্গে কথা বলব’।

৭৪৭-এ রয়ে যাওয়া একটি মরদেহ

আমার মা মারা যায় লসঅ্যাঞ্জেলেসে, বলতে গেলে অন্য একটি উপকূলে, এখান থেকে সেটি অনেক দূর। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বোস্টনে মায়ের মরদেহ এলো। একটি বড় বাক্সের মধ্যে বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ মা’র নিথর দেহ ছিল বোয়িং ৭৪৭-এ। সে সন্ধ্যায় যখন আমাকে সোফায় বসে টেলিভিশন দেখার অনুমতি দেওয়া হলো, আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। ‘ওয়ান্ডার উইম্যান’ সিরিজ চলছিল তখন টিভিতে। সে সময় কেন যেন আমার মায়ের কথা মনে পড়ল। আমি ভাবছিলাম, যে বিমানে চড়ে আমার মা আসছেন সেখানে তার বাক্সের পাশে বসে কেউ হয়তো সিগারেট খাচ্ছে, সেই ছাইয়ের গুঁড়ো এসে পড়ছে আমার মায়ের শরীরে। সেই সপ্তাহের শেষে, ট্রাকে করে আমার মাকে একজন ব্যক্তি নিয়ে এলো। সে আমার নানিমার হাতে সঙ্গে আনা জিনিসগুলো দিয়ে গেল, ধন্যবাদ জানাল। ভদ্রতা করে আমার নানিমাও মাথা নাড়ালেন শুধু। মায়ের বন্ধু সব জিনিস বেশ সুন্দরভাবে আলাদা আলাদা করে প্যাক করে দিয়েছে। আমার মায়ের জীবন যেন এখন শুধু একটি খামে বন্দি। জিনিসগুলোর মাঝে কিছু আংটি আর গহনা ছিল।

আমি জানতে চেয়েছিলাম কীভাবে এয়ারপোর্ট থেকে আমার মাকে চার্চ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম মাকে একবার মাটিতে শোয়ানোর পর কীভাবে তার প্রতিটি অঙ্গ এবং মস্তিষ্কে কীটপতঙ্গ আসে। আমার এক বন্ধু আমায় বলেছিল, তার বড় বোন তাকে বলেছে, এমন হয় শুধু মৃত মানুষের সঙ্গে। এটা আর কেউ বুঝতে পারে না। কিছুদিন পর নানিমাকে দেখলাম, ড্রয়ারে মায়ের জমিয়ে রাখা সব জিনিস একদিন পরিষ্কার করে ফেলল।

‘ফিলোডেনড্রন’ নামের সেই গাছটি

এটি সেই সময়ের কথা যখন বাড়িতে ‘ফিলোডেনড্রন’ নামের গাছটি এলো। কে পাঠিয়েছে সে বিষয়ে উপহারের গায়ে কিছু লেখা ছিল কি না, সেটা খোঁজার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও জানা গেল না কার দেওয়া উপহার এটি। সে জন্যই হয়তো গাছের প্রতি কারও খুব একটা নজরও ছিল না। প্রথমে গাছটি পড়ে রইল রান্নাঘরের একটি কোনায়। আসলে কেউ বুঝতেই পারছিল না, এটিকে কীভাবে রাখা উচিত। দীর্ঘদিন অযতেœর কারণে গাছটি যখন প্রায় মরতে বসেছিল, তখন নানিমা একে খেয়াল করলেন। গাছটিকে তিনি ছেঁটে দিলেন, বাদামি হয়ে যাওয়া পাতাগুলোকে ফেলে দিলেন। নতুন করে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিলেন। নতুন যতেœ গাছটি যেন নবজীবন পেল। গাছের শীর্ণ ডালে নতুন পাতা এলো। সাদা রঙের ফ্রিজের পাশে সবুজ ছোট্ট এই গাছটিকে না দেখার উপায় রইল না আর। মাঝে মাঝে তো লতানো গাছের ছড়ানো ডালগুলো দরজা বা ম্যাগনেটে আটকে যায়।

বসন্ত শেষে গ্রীষ্মও চলে এলো। গাছটি বেশ বড় হয়েই যাচ্ছিল। ড্রাইভওয়েতে হাঁটার সময় বহুদূর থেকেও গাছটিকে আমি দেখতে পেতাম। আমাদের বাড়ির মালিকের কুয়িকুইগ নামে একটি কুকুর আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আট বছর বয়সে সেই নামটি আমার কাছে অদ্ভুত লাগলেও কলেজে পড়ার সময় জেনেছিলাম এই নামটি এসেছে ‘তিমিদের দুর্বৃত্ত’ নামের একটি বই থেকে। তার সঙ্গে আমার বেশ ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আমার মনে হতো, সে আসলে আমারই। কিন্তু আমার কখনো পোষা কোনো প্রাণী ছিল না, কারণ নানিমা চাইতেন না। তারা খুব অগোছালো আর বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে, আর বরফ পড়লে তাদের কারও কাছে রেখেও যাওয়া যায় না অথবা কোনো পার্টিতেও যাওয়া যায় না। ওরা বাড়িতে থাকে এই আশায় কখন ওকে কেউ একজন বাইরে নিয়ে যাবে হাঁটার জন্য, আর যদি এমনটি না হয় তবে রান্নাঘরের মেঝে নোংরা করে ফেলবে। এমন নানাবিধ কারণে আমার আর পোষা প্রাণী রাখা হয়নি।

এই গাছটিই এখন আমার পোষ্যের মতো। আমি এটিকে পানি দিই, খেতে দিই। ভাবছিলাম, একে একটা নাম দেওয়া যায় না? কুকুরটার মতো ফিদো অথবা স্পট নামের কিছু। মায়ের মৃত্যুর পর গাছ উপহার হিসেবে পাওয়া আমাদের জন্য কিছুতা অস্বাভাবিকই ছিল। কোনো একটি জীবন্ত জিনিস যার যতœ নিতে হবে এমন উপহার সাধারণত কেউ দেয় না। উপহার হিসেবে সাধারণত নানা ধরনের ছবিযুক্ত কার্ড, হাতে বানানো খাবার এগুলোই আসে। অথচ এই গাছটি অজানা কোনো এক জায়গা থেকে চলে এলো।

গাছটি যখন আমার মা

কেউ মারা গেলে তার পরিবারকে ফিলোডেনড্রনস উপহার হিসেবে দেওয়া কিছুটা বিরক্তিকর বটে। এই গাছে না হয় কোনো কুঁড়ি, না কোনো ফুল। এই গাছ উজ্জ্বল বা তীব্র আলোতেও ভালো থাকে, আবার অল্প আলোতেও টিকে যায়। খুব বেশি পানি না পেয়েও বাড়িতে খুব সুন্দরভাবে এরা বেড়ে উঠতে পারে। হার্ট শেপের ফিলোডেনড্রনকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বরং মেরে ফেলা কঠিন। অল্প যতেœই এরা বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। নানিমা গাছটিকে অপছন্দ করতেন এমন নয়, আমার ধারণা তিনি আসলে দায়িত্ব নিতে ভয় পেতেন। যতœ নিতে হবে এই ভয়ে প্রতিটি জীবন্ত জিনিসকেই নানিমা মেরে ফেলেছেন। শুধু কিছু গাছ টিকে আছে যেগুলোতে খুব বেশি পানি দিতে হয় না কারণ গাছে পানি দেওয়ার কথা তিনি প্রায়ই ভুলে যান। গাছ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা যে নানিমার একদমই ছিল না তা অবশ্য নয়। গাছে পানি দেওয়ার সময় আমার সব সময় মনে হতো, মা বুঝি এভাবেই ভ্যান নুইসের অ্যাপার্টমেন্টে এভাবে পানিতে ডুবে যাচ্ছেন। হয়তো ভয় পাওয়ার আগেই তাকে মরে যেতে হয়েছিল। হয়তো সে ফিলোডেনড্রনের মতো করে বাঁচতেই চায়নি।

সাপ্তাহিক কেনাকাটার জন্য দোকানে গিয়ে আমি দারুণ একটি জিনিস জেনেছিলাম। একজন বয়স্ক স্ত্রী তার স্বামীকে বলছিলেন, ‘গাছের সঙ্গে কথা বললে তারা দ্রুত বেড়ে ওঠে’। গাছ কীভাবে মানুষের কথা বুঝতে পারে তা জানতে আমি সেই আট বছর বয়সেই একটি বই নিয়ে এলাম। জানলাম, ১৮৪৮ সালে একজন জার্মান প্রফেসর জানিয়েছিলেন, গাছের জীবন আছে। তখনই আমি আমার বড় ভাইকে কথাটি জানিয়ে বললাম, আমাকে আরও কিছু বোঝাতে। কিন্তু সে আমার কথা তো শুনলই না, আমার হাতে বেশ জোরে একটি চিমটি দিয়ে বলল, গাছের সঙ্গে কথা বলা স্রেফ একটা পাগলামি। তার দিকে পাত্তা না দিয়ে আমি গাছের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করলাম। আমাদের কথাবার্তাগুলো একতরফাই হতো। গাছকে আমি প্রতিদিন আমার সঙ্গে কী কী ঘটত তার সব বলতাম। অন্য যে কোনো মানুষের চেয়ে গাছ সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনত।

এর ঠিক পরের বছর, আমার সেই পুরনো বন্ধুটির বড় বোন ফের জানাল, মৃত ব্যক্তির আত্মা জীবিত গাছের মাঝে চলে আসে। তাই আমি চাইলে সবুজ এই গাছটিকে আমার মা ভাবতে পারি। তার ঘন বাদামি চুলের জায়গায় রয়েছে সবুজ পাতা। গাছের পুরো শরীর যেন আমার মায়ের শরীর। গাছকে আমি মা ভাবছি এমনটি আমার নানিমা জানলে খুব ভালো চোখে দেখবে না আমি জানতাম। আমি শুধু ভাবছিলাম ছোটবেলার অন্য গাছগুলোকে যেভাবে অযতেœ মরে যেতে হয়েছে, এর পরিণতিও নিশ্চয়ই তাই হবে। আমার মা, যার সঙ্গে আমি কথা বলছি, যে গাছ আমাকে অক্সিজেন দিচ্ছে, তার জন্যই আমি বেঁচে আছি। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, যে মা বেঁচে থাকতে আমাকে কোনোদিন যতœ করতে পারেনি, আমার খেয়াল রাখতে পারেনি, মৃত্যুর পর সে অক্সিজেনের মাধ্যমে আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে। আমি যখন খাবার ঘরে বসে খাই অথবা সকালের নাস্তা করি, তখন মা তার হার্ট শেপের পাতা দিয়ে আমাকে খুব ভালো করে লক্ষ করেন।

গাছের চলে যাওয়া

আমি বড় হলাম, কলেজে পড়া শুরু করলাম। গাছটির প্রতি নানিমার ভালোবাসাতেও আমি মুগ্ধ হলাম। প্রতিবার ঘরে ফিরে আমি আগে গাছটিকে দেখি। নানিমা গাছটির ডাল কেটে অন্য আত্মীয়দেরও দিয়েছেন। আমার মা সেইসব ঘরে গিয়েও নতুনভাবে বেঁচে আছে। সবাইকে অক্সিজেনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখছে। গাছ হয়ে আমার মা সবার সঙ্গেই আছেন যতটা তিনি জীবিত থেকে পারেননি। অনেকের বিয়ে হলো, পরিবারে নতুন অতিথি এলো, অনেকের মৃত্যু হলো। একদিন আমার নানিমা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ক্যানসার তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। নানিমা মারা যাওয়ার বেশ কিছু সময় পর আমি খবর পেলাম। আমি শুধু তাকে বিদায় জানাতে পেরেছিলাম। নানিমার মৃত্যুর পর আমি তার নিশ্চুপ বাড়িতে গিয়ে শুধু তাকে একবার অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম।

এর কিছুদিন পর, বাড়িতে থাকা জিনিসগুলো দান করে দেওয়ার জন্য বাসাটি পরিষ্কার করা শুরু করলাম। অদ্ভুতভাবে লক্ষ করলাম, সেই হার্ট শেপের পাতাওয়ালা গাছ যেটিতে কোনো ফুল ফুটত না, আমার সমস্ত ভয়-গল্প-কথা যার কাছে জমানো ছিল সেই গাছটি বাড়িতে নেই! ব্যাপারটি খুব অদ্ভুত ছিল কারণ আমি যখনই বাড়িতে আসি তখনই সে আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য একই জায়গায় থাকে। অথচ গাছটি চলে গেল, যেভাবে এক সময় আমার মা চলে গিয়েছিল, আর এখন আমার নানিমা। আমি আরও একবার আমার মাকে হারালাম।

লেখিকা : নিকোল জনসন (আলজাজিরা থেকে অনুবাদকৃত)