টাকা বা ব্যাংক নোটের হাতবদলের সঙ্গে বিস্তার ঘটছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের। নোটের মাধ্যমে করোনার বিস্তার ঠেকাতে চীন বাজার থেকে পুরনো নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছেড়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের নগদ টাকা লেনদেনের বদলে অনলাইনে লেনদেন করতে উৎসাহিত করেছে দেশটি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রায় শতভাগ লেনদেন করে নগদ টাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, ব্যাংক নোটের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই নগদ টাকা বা সরাসরি লেনদেনের বদলে অনলাইনে লেনদেন করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের মানুষ নগদ টাকা লেনদেনে অভ্যস্ত। শহরাঞ্চলে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের বাইরে সবাই নগদ টাকা লেনদেন করেন। তাই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে ব্যাংক নোটের মাধ্যমে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এ অবস্থার মধ্যে আশ্বস্ত করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনাভাইরাস ঠেকাতে প্রয়োজনে বাজার থেকে পুরনো নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাড়ার পরিকল্পনার কথা জানালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম।
গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের রোগী এখনো শনাক্ত হয়নি। তা যদি হয় এবং ব্যাংক নোটের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই তা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। নতুন নোট ছাপিয়ে বাজার থেকে পুরনো ও ময়লাযুক্ত নোট তুলে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, চীন যেভাবে হুবেই প্রদেশ থেকে পুরনো নোট তুলে নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় তা সংরক্ষণ করেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমন পরিস্থিতি নাও হতে পারে। তবে প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছে।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর গত মাসে চীন প্রথম হুবেই প্রদেশ থেকে পুরনো ব্যাংক নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাড়ে। পুরনো নোটগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় প্যাকেটজাত করে সেগুলোকে ভাইরাসমুক্ত করতে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। চীন তার নাগরিকদের নগদ টাকার বদলে অনলাইনে লেনদেনে উৎসাহিত করে। দক্ষিণ কোরিয়াও গত মাসে করোনার ছড়ানো ঠেকাতে এ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নগদ টাকা ছাড়া লেনদেন করা খুবই কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংক নোট ধরা বা ছোঁয়ার পর সবাইকে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়ে গত সোমবার ডব্লিউএইচও বলেছে, করোনাভাইরাস ঠেকাতে যতটা সম্ভব দেখা-সাক্ষাৎ না করে বা সরাসরি ব্যাংক নোট লেনদেন না করে অর্থ লেনদেন করা জরুরি। যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও বলেছে যেÑ নোট ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া বহন করে। তারাও নোট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বাংলাদেশের একদল গবেষক গত বছরের আগস্ট মাসে বলেছিলেন, তারা বাংলাদেশি কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রায় এমন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন, যা সাধারণত মলমূত্রের মধ্যে থাকে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্রী নিশাত তাসনিম প্রায় ছয় মাস ধরে বাজারে প্রচলিত টাকা ও কয়েন নিয়ে গবেষণা করে বলেন, এসব মুদ্রায় তিনি ই-কোলাই জাতীয় ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন। ১৫টি উৎস থেকে নেওয়া কাগজের টাকার নোট ও কয়েনে এক হাজারের চেয়ে অনেক বেশিমাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখেছেন তারা। এক হাজার মাত্রা পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়াকে সহনশীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী টাকা নিয়ে করা ওই গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। এর আগে তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, এ পরীক্ষায় আমরা যা পেয়েছি তা জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ভয়াবহ। কারণ সাধারণ ব্যাকটেরিয়া তো আছেই, সঙ্গে পাওয়া গেছে মানুষের মলমূত্র থেকে আসা ব্যাকটেরিয়া, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক। ফলে এসব মুদ্রার মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তিনি।
ড. চৌধুরী বলেন, যেহেতু আমরা গবেষণা করে টাকায় বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া পেয়েছি যা মানুষের অন্ত্রে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি করে, তাই এর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়। তার মতে, টাকা বা ডলারের ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক বিনিময়ের মাধ্যমে করোনাভাইরাস শুধু একটি দেশের মধ্যে নয় বরং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
তিনি বলেন, যেহেতু এটা সরাসরি মানুষ হাত দিয়ে ধরে, অনেক সময় মুখের থুতু নিয়ে কাউন্ট করে। তাই এর মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেখান থেকে এটা হতে পারে যদি মানুষ সে হাতে খায়, মুখে দেয়।
তার মতে, ভাইরাস বাহকের শরীরে সক্রিয় হয়, অন্যত্র নিষ্ক্রিয় থাকে। টাকায় থাকলে সে হয়তো নিষ্ক্রিয় থাকে, কিন্তু মানুষের সংস্পর্শে এলে সেটি করোনাভাইরাসের উপসর্গ বা রোগের সৃষ্টি করতে পারেÑ এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশে এখনো করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি বলে জানিয়েছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এ পর্যন্ত একশোটিরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করলেও তাতে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব মেলেনি।
নোটের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কার পর বিশেষজ্ঞরা ব্যাংক নোট এড়িয়ে স্পর্শবিহীন মাধ্যম বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেনাকাটা বা লেনদেন করার পরামর্শ দিয়েছেন। স্পর্শবিহীন লেনদেন বা প্রযুক্তি বলতে ব্যাংক নোট ছাড়া অন্য মাধ্যম যেমন কার্ড, বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ যেমন বিকাশ বা নগদ অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেনদেনের কথা বোঝানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে প্রায় শতভাগ লেনদেন হয় ব্যাংক নোটের মাধ্যমে সেখানে কীভাবে এই পরামর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু এখনো করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি তাই এখনই এ বিষয়ে বলাটা কঠিন।
তবে যদি শনাক্ত করা হয়, সেক্ষেত্রে ভাইরাসটি যাতে অতিমাত্রায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য ব্যাংক নোট ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই টাকা গোনার সময় হাত দিয়ে মুখের লালা নেওয়া যাবে না, ব্যাংক নোট বা টাকা নড়াচড়ার পরপরই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। যারা সব সময় নোট নড়াচড়া করেন, যেমন ব্যাংক কর্মী বা মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীরা, তাদেরকে অবশ্যই অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। তারা দস্তানা বা গ্লাভস পরে নিতে পারেন। সতর্কতা হিসেবে হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করতে পারেন। টাকা ধরা বা ব্যবহারের পরপরই চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়া যাবে না।