চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি আওয়ামী লীগ। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট (টিআইসি) মিলনায়তনে প্রায় তিন ঘণ্টার ‘সমঝোতা’ বৈঠক শেষ হয়েছে হট্টগোলের মধ্য দিয়ে। সেখানে কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহারে রাজি হননি। উল্টো কাউন্সিলর পদটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানান তারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গেও অনেকে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। ফলে ৮ মার্চ মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে নগর কমিটির নেতারা জানিয়েছেন। ওই সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত থাকবেন।
২৯ মার্চ চসিক নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৮ মার্চ। এই নির্বাচনে মেয়র পদে এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী করলেও কাউন্সিলর পদে দল মনোনীতদের বাইরে একাধিক নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সাধারণ ও সংরক্ষিত ৫৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৯টিতেই দলের সমর্থনবঞ্চিত অন্তত পাঁচজন করে কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এসব বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ে গতকাল সমঝোতা বৈঠকে বসেন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমন্বয়কারী দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বৈঠকে বিদ্রোহী ঠেকাতে কেন্দ্রীয় নেতারা ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহারে রাজি হননি। উল্টো কাউন্সিলর পদটি উন্মুক্ত করার দাবি জানান তারা।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা জানান, নগরীর সব কটি ওয়ার্ডে দল মনোনীত ছাড়াও বেশির ভাগ বিদ্রোহী প্রার্থী বৈঠকে উপস্থিত হন। তাদের উদ্দেশে শুরুতে বক্তব্য দেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও আ জ ম নাছির উদ্দীন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনে যারা দলের সমর্থন পেয়েছেন, এ সমর্থন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নেত্রী মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। এসব প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই, সবাইকে তাদের পক্ষে কাজ করতে হবে।’
তার বক্তব্যের মধ্যেই বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা ‘ওপেন ওপেন’ বলে সেøাগান দেন। মোশাররফ হোসেন তাদের একাধিকবার থামিয়ে বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কেউ এটি অমান্য করলে তাকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স। ৮ মার্চ মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক (ওবায়দুল কাদের) আসবেন। সেখানেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য শেষে আবারও বিদ্রোহী প্রার্থীরা ‘ওপেন ওপেন’ বলে সেøাগান দিয়ে হট্টগোল শুরু করেন। সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সমর্থন না পাওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন তাদের থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অনেকে তার সঙ্গেও তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
হট্টগোলের মধ্যে টিআইসি মিলনায়তনের মূল ফটক দিয়ে বের না হয়ে বিকল্পপথে সভাস্থল ত্যাগ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। পরে অন্য নেতাকর্মীরাও একে একে চলে গেলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সমঝোতা বৈঠক শেষ হয়। পরে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্রোহীরা মিলনায়তনের মাঠে কাউন্সিলর পদ সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে সেøাগান দেন।
এ সময় চসিকের ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর ইয়াছিন চৌধুরী আছুর ভাইকে আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। উনি গতবার ৯০০ ভোট পেয়েছিলেন। আমি সাড়ে তিন হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলাম। বিএনপির কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে এলাকায় অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করেছি। এরপরও আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আমি দলের সমর্থন তুলে নিয়ে কাউন্সিলর পদটি ওপেন করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ সমর্থনবঞ্চিত বর্তমান কাউন্সিলর আনজুমান আরা বেগম বলেন, ‘নেত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে একটি মহল বিতর্কিতদের মনোনয়ন দিয়েছে। আমি তিনবারের কাউন্সিলর। জনপ্রিয়তা থাকলেও কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো জানি না। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, উন্মুক্ত নির্বাচন দেওয়া হোক। আমিই আবারও জিতব।’ এ সময় বিদ্রোহী প্রার্থীরা জানান, যত কঠোর সিদ্ধান্তই আসুক, তারা নির্বাচনে থাকবেন।
বৈঠকের বিষয়ে নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোশাররফ ভাই বিদ্রোহীদের অনেক বুঝিয়েছেন। তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হননি। এখন বিদ্রোহীদের বিষয়ে দলের হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা-ই হবে।’
বৈঠকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, নঈম উদ্দিন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, আলতাফ হোসেন বাচ্চু, কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম, এম এ লতিফ এমপি, মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।