বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নওরীন ঊর্মিকে একই বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাত ও দলবল নির্যাতন চালায় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। নওরীনের পরিবার দেশ রূপান্তরকে এ সন্দেহের কথা জানিয়ে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত সিফাত। ২০১৮ সালের মার্চে নওরীনকে অজ্ঞাত ফোন নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হলে ১৭ মার্চ বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী সিফাত তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান হেনা রানী বিশ্বাস ও প্রভাষক সুজিত কুমার বালার সহায়তায় চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা তুলে নিতে বাধ্য করেন।। এরপরও নিয়মিত নওরীনকে হুমকি দেওয়া হতো। কিন্তু ভয়ে কিছু বলত না। এ কারণে ভয়ে এবারের ঘটনায় কোনো মামলা করেনি পরিবার।
নওরীনের পরিবারের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হেনা রানী ও সুজিত কুমার। আর মহিউদ্দিন আহমেদ সিফাত ওই হামলার ঘটনা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
স্বজনরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নির্যাতনে অসুস্থ নওরীন ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। নওরীন এর আগে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, ১ মার্চ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবনের সিঁড়িতে তাকে ঘিরে ধরে একদল মুখোশধারী। চিৎকার বন্ধ করতে তার মুখ চেপে ধরে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়। তাকে গামছা দিয়ে বেঁধে লাঠিসোঁটা দিয়ে আঘাত ও জ্যামিতি বক্সের কাঁটা দিয়ে ‘স্পর্শকাতর স্থানে’ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জখম করা হয়।
নওরীনের স্বজনরা গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, নিরাপত্তার ভয়ে প্রথমে তাকে বাসায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। ক্ষত স্থানে ইনফেকশন দেখা দিলে ও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বুধবার তাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরের দিন বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়। বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নওরীনের চিকিৎসা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নওরীনের এক স্বজন বলেন, ‘নওরীন সিফাতকে পছন্দ করত না। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও পছন্দ করত না। এতে ক্ষিপ্ত সিফাত নওরীনকে বিভিন্ন সময়ে উত্ত্যক্ত করত। ২০১৮ সালে ওর মোবাইলে অজ্ঞাত ফোন নম্বর থেকে একটি ফোনকলের মাধ্যমে হত্যার হুমকি আসে। আমরা কারও নাম উল্লেখ না করে সাধারণ ডায়েরি করি। কিন্তু সিফাত গণিত বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান হেনা রানী ও প্রভাষক সুজিত বালার সহায়তায় জিডি তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করে। ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও নওরীনের হাজিরা তোলা হতো না। পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দিয়ে ফেল করানো হতো। বিভাগীয় চেয়ারম্যান তার রুমে ডেকে জিডি প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিত। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে নওরীন জিডি তুলে নেয়। এরপর থেকেই সিফাত ওকে আরও বেশি উত্ত্যক্ত করত। কিন্তু ভয়ে কিছু বলত না।’ সিফাতের সহযোগী হিসেবে ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আমিন সালেহীর নামও বলেন ওই স্বজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার হাসপাতালে অবস্থানরত নওরীনের আরেক স্বজন বলেন, ‘শেরে-ই-বাংলা মেডিকেলে ভর্তি করার পর থেকেই মামলা না করার জন্য আমাদের ওপর চাপ দেওয়া হতে থাকে। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসা না করিয়ে বাসায় চিকিৎসা করানোর জন্য চাপ দেয়। এ জন্য ঢাকায় আমরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। তাও অনেক গোপনে। সিফাত নিজেকে বর্তমান বরিশাল সিটি মেয়রের অনেক ঘনিষ্ঠ হওয়ার দাবি করে। তাই আমরা বিচার পাওয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। তাই ভয়ে মামলা করিনি।’
তবে আদৌ হামলা হয়েছে কি না, সেটা নিয়েই সন্দেহ রয়েছে দাবি করে সিফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাকে নাকি নকল করতে নিষেধ করায় সে পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে চলে যায়। তার ওপর হামলা হয়েছে এটা কেউ দেখবে না। একজনও প্রতক্ষ্যদর্শী নেই। সে একেবারে একা আহত মেয়ে কীভাবে চলে গেল। তিন দিন পর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাকে যাতে পরীক্ষায় ছাড় দেওয়া হয় সে জন্য সে এ ধরনের একটি ন্যক্কারজনক রাজনীতি করেছে। আমি দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ক্যাম্পাসে আছি। রাজনীতি করি, তাই কিছুটা প্রভাবশালী। মোটামুটি বলা যায় আমি ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও এটা নিয়ে কথা বলে না। প্রথম বিষয় আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে ষড়যন্ত্র হতে পারে। এ ছাড়া নওরীনের পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের কিছু সমস্যা আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের পরিচয় থাকলেও আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো না। এ জন্য জেলাসি থেকেও এই ষড়যন্ত্র হতে পারে।’
চাপ দিয়ে জিডি তুলতে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে গণিত বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান হেনা রানী বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, নওরীন যখন সাধারণ ডায়েরি করেছিল তখন আমি বিষয়টি অবগত হয়ে সিফাত ও নওরীনকে ডেকেছিলাম। কিন্তু নওরীন তখন সিফাতের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে। পরে আমি বিষয়টি মিটমাট করে দিই। নওরীনের কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল। এ জন্য আমি আলাদাভাবে পরীক্ষা নিয়েছি। এখন ও যদি পরীক্ষার খাতায় কিছু না লেখে তাহলে কীভাবে নম্বর দেব। আর আমাদের খাতায় কারও নাম লেখা থাকে না। একজন পরীক্ষক নম্বরে কারচুপি করলেও দ্বিতীয় পরীক্ষকের হাতে সেটা ধরা খাবে। তদন্তের স্বার্থে আমি পরীক্ষার খাতা দেখাতে প্রস্তুত।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) বন্দর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা হামলার ঘটনা শোনার পর বিএমপির উপপুলিশ কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন অনেকেই মেয়েটিকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছি। আমরা মামলা করার জন্য মেয়ের বাবা ও বোনকে বলেছিলাম। ওনারা জানিয়েছেন, চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাচ্ছি। এসে মামলা করব। এরপরও আমরা তদন্ত করছি। পরিবার মামলা করুক বা না করুক, আমাদের তদন্ত চলবে।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ছাদেকুল আরেফিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া যায়। প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাসের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।