নগদ টাকা ও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির অধোগতিতে ২০১৮ সাল থেকেই সংকটে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আর উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের কারণে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতও স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে বড় অঙ্কের বকেয়া পরিশোধের বাধ্যবাধকতায় পড়েছে গ্রামীণফোন। ২০১৮ সাল থেকে এই তিন খাতই পুঁজিবাজারকে বড় ধরনের সংকটের মুখে ফেলেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের পর থেকে অব্যাহত দরপতনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৮৬ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা, যার ৭৪ শতাংশই ব্যাংক, এনবিএফআই ও টেলিযোগাযোগ খাতের। এ সময়ে ব্যাংক, এনবিএফআই ও টেলিযোগাযোগ খাত ছাড়াও প্রকৌশল ও খাদ্য খাতের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দর কমেছে। এসব খাতের কারণে ২০১৮ সালের পর থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১৮৬০ পয়েন্ট ৩০ শতাংশ।
বিতরণকৃত ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংক খাতের মুনাফা চলে যাচ্ছে সঞ্চিতি সংরক্ষণে। এতে কোনো কোনো ব্যাংক মূলধন সংকটেও পড়ছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ কমে যায়। ২০১৯ সালে খেলাপি পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় খাতটির নিট মুনাফা আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নির্ধারণ করায় খাতটি আরও চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। নিট মুনাফা আরও কমার শঙ্কায় পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এমন অবস্থায় লোকসান এড়াতে ব্যাংক খাতের শেয়ার ধরে রাখতে চাইছেন না বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে বিদেশিরা। এতে বিক্রিচাপে পড়ে ২০১৮ সাল থেকে ব্যাংকের শেয়ার দর ধারাবাহিকভাবে কমছে। এ সময়ে খাতটির বাজার মূলধন ৭৩ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা থেকে ৩৫ শতাংশ কমে ৪৮ হাজার ১১০ কোটি টাকায় নেমেছে।
পুঁজিবাজারের মূল্যসূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে ব্যাংক খাত। শীর্ষ মূলধনী এ খাতটির ফ্রি-ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ারও সবচেয়ে বেশি। আর ডিএসইর মূল্যসূচক গণনা করা হয় লেনদেনযোগ্য শেয়ারের ভিত্তিতে। গত ২৬ মাসে খাতটির বাজার মূলধন ২৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সূচকে।
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের পরিচালকদের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এনবিএফআই খাতের একটি কোম্পানি অবসায়নের ঘোষণায় বিরূপ প্রভাব পড়ে পুরো খাতটিতে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ আরও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করে প্রশান্ত কুমার হালদার বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় পুরো এনবিএফআই খাতের ওপরই বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা প্রকাশ পায়। ফলে এ খাতটির সবগুলো কোম্পানির শেয়ার দর হারায়। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারিতে এ খাতটির বাজার মূলধন ছিল ২৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের ৫ মার্চ ১৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকায় নেমেছে। এ সময়ে এনবিএফআই খাত প্রায় ৪৩ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে।
একক কোম্পানি হিসেবে ডিএসইতে সবচেয়ে বড় বাজার মূলধনী কোম্পানি হচ্ছে গ্রামীণফোন। এই কোম্পানির শেয়ার দর ১ টাকা কমলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক কমে শূন্য দশমিক ৬ পয়েন্ট। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারিতে গ্রামীণফোনের বাজার মূলধন ছিল ৬৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। আর পাওনা আদায়কে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের এপ্রিলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিবাদের পর থেকেই এর শেয়ার দর কমতে শুরু করে। সর্বশেষ কোম্পানিটির বাজার মূলধন নেমে এসেছে ৩৬ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। এ সময়ে গ্রামীণফোনের শেয়ার দর ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ কমায় কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ২৬ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা।
এই তিন খাত ছাড়াও ২০১৮ সালের পর ডিএসইর প্রকৌশল খাত ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা, খাদ্য ও অনুষঙ্গ খাত ৬ হাজার কোটি টাকা ও ওষুধ খাত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা দর হারিয়েছে। আর কাঁচামাল ও জ¦ালানি দর বাড়ায় সিমেন্ট খাতের মুনাফা কমে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে খাতটির বাজার মূলধন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।