আ.লীগে বঞ্চনাবোধ থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন অনেকে

ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ পুড়ছে বলে মনে করছেন দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতারা। ক্ষমতাসীন দলটির অন্তত এক ডজন কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতা দেশ রূপান্তরের কাছে এ অভিমত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যোগ্য-দক্ষ ও মেধাবী নেতারা কেন্দ্রে যেমন পদ-পদবি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাংগঠনিক জেলায়ও বঞ্চিত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। পদ-পদবি ও ক্ষমতা বঞ্চিত হতে হতে দুঃসময়ের নেতাকর্মীরা এখন হতাশাগ্রস্ত। আর পাপিয়াদের মতো নব্য নেতারা পদ-পদবিও পাচ্ছেন; ভোগ-বিলাসও করছেন। গত এক দশক ধরেই এ অবস্থা চলছে। ফলে এক ধরনের জেদ ও অভিমান চেপে বসেছে দুঃসময়ের আওয়ামী লীগের শুভাকাক্সক্ষীদের মনে। ক্যাসিনো কারবারি ও পাপিয়া মার্কা নেতাদের ভিড়ে তারা এখন আর দলে সক্রিয় হতে চান না। আবার কেউ কেউ চাইলেও সে সুযোগ নেই। সব মিলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও দিন দিন দুর্বল সংগঠনে পরিণত হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে দলের নেতাদের ভেতরে ভীষণ জেদ ঢুকেছে। সত্যিকারের আওয়ামী লীগের রাজনীতি এখন আর আওয়ামী লীগের ভেতরে নেই। অনেকটা আমলা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের পরামর্শেই চলছে ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি। আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীদের ভেতরে যে অভিমান বা জেদ তৈরি হয়েছে তার কারণও এটি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সর্বশেষ সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাবেক আমলা-ব্যবসায়ী নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দেখলেও প্রতীয়মান হয় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য কতটা বেড়েছে। আর ফুলটাইম যারা রাজনীতি করে আসছেন তারা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ দলের জাতীয় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা পদবঞ্চিত হয়েছেন। বঞ্চিত হয়েছেন সম্ভাবনাময় ও স্বচ্ছ ইমেজের অনেক নেতাও। এর ফলে তাদের মনে যে অভিমান বা এখন দলে সক্রিয় না হওয়ার জেদ তৈরি হয়েছে তাতে দিন দিন সাংগঠনিক শক্তি তলানির দিকে চলে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের অবস্থা এমন হয়েছে যে সংগঠন কী করছে না করছে তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই নেতাকর্মীদের মাঝে। জনগণও আর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকান্ডে আগ্রহ দেখায় না। সবাই তাকিয়ে থাকে সরকারের দিকে, সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দিকে। সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনের পর দল নিয়ে এমন ভাবনা তৈরি হয়েছে নেতাকর্মী ও জনসাধারণের মনে।   

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর সাবেক এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কেন পদ দেওয়া হয়েছে সেটা যেমন জানতাম না, তেমনি কেন পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে সেটাও জানতাম না। কিন্তু রাজনীতি করে গেছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে। বঙ্গবন্ধুকন্যার মুখ চেয়ে। এখন আর রাজনীতি করার আগ্রহ পাই না। 

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সর্বশেষ ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ব্যবসায়ীকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে দলের বড় একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে অনেকটা হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব অনেক কারণে দলের বিভিন্ন মিটিং-সিটিংয়ে নেতারা কোনো কথা বলেন না। নেতাদের দাবি আলোচনা করে লাভ নেই। সিদ্ধান্ত যা হওয়ার তাই হবে। তিনি বলেন, ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন অনেকটা নেতাশূন্য থাকে। হাতেগোনা কয়েকজন নেতা যাতায়াত করেন। না যাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, সেখানেও জেদ কাজ করে। আর দুই/তিন জন নেতা মনে করেন, দলীয় কার্যালয় তাদের নিজস্ব সম্পত্তি। সম্পাদকমন্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ছয় মাস পর দলীয় কার্যালয়ের চিত্র আরও খারাপ হবে।   

ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রামে-গঞ্জে গেলে পোড় খাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখে শুনি দলকে ক্ষমতার বাইরে দেখতে চাই অন্তত একবার। কারণ যারা এখন সরকার ও দলকে ঘিরে ধরে আছে দুঃসময়ে এলে তারা কী করে তা দেখতে চাই। তিনি বলেন, ২৭ বছর আগে যারা ছাত্রলীগ থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের একজনকেও এবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়নি। অথচ নেতৃত্ব গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ ছিল এবার। ওই নেতা আরও বলেন, গত নির্বাচনে আমলা, ব্যবসায়ী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের পরামর্শে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত করা হয়েছে স্বচ্ছ ইমেজের তরুণ নেতৃত্বকে। সারা দেশে বাছাই করে অন্তত একশ তরুণ রাজনীতিকের হাতে মনোনয়ন তুলে দেওয়া হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি এতটা সংকটে পড়ত না। তিনি বলেন, যেসব আমলা-ব্যবসায়ী মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন তারা কেউ দলের দুঃসময়ে হাল ধরবেন না। তৃণমূলের রাজনীতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে এসব সংসদ সদস্যের কারণে।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাগ, ক্ষোভ ও জেদ এসব মিলিয়েই আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, এখানে ভুল বোঝাবুঝি থাকে। কিন্তু সংগঠনের স্বার্থে প্রয়োজনে সবাই আবার এককাতারে দাঁড়ায়। ফারুক খান বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় সংগঠন। সবার সব চাওয়া-পাওয়া রাখা সম্ভব হয় না। আর যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবীও আওয়ামী লীগে অসংখ্য।