নির্বাহী আদেশে খালেদার মুক্তি চেয়েছে পরিবার

তিন মাসের ব্যবধানে হাইকোর্ট দ্বিতীয় দফায় কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর এবার তার সাময়িক মুক্তি চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী শর্তহীনভাবে যেকোনো কারাবন্দির সাজা স্থগিত করে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি দিতে পারে।

এদিকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার পরিবারের  সদস্যরা সাময়িক মুক্তি চেয়ে আবেদন করার বিষয়টি স্বীকার করেননি। এমনকি এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুই জানেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসচিবের সঙ্গে আলাপ করেই পরিবারের সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে আবেদন করা হয়েছে তাকে কি প্যারোল বলা যাবে জানতে চাইলে গতকাল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, না, এটি প্যারোল নয়। এটি সাময়িক মুক্তি। কারাবন্দি যে কেউ সরকারের কাছে যেকোনো কারণ দেখিয়ে সাময়িক মুক্তির আবেদন করতে পারে। কারণে সন্তুষ্ট হয়ে সরকার নির্বাহী আদেশে তার আবেদন বিবেচনা করতে পারে।

তিনি বলেন, এটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারা অনুযায়ী সরকার শর্তহীনভাবে যেকোনো কারাবন্দির সাজা স্থগিত করে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি দিতে পারে।

যেকোনো মূল্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি চান তারেক রহমান : লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে তারেক রহমান খুবই উদ্বিগ্ন। যেকোনো প্রক্রিয়ায় হোক বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়। মুক্ত খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চায়। তাদের আশা আগামী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর দিনের আগে সরকার গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্ত করে দেবে।

বিএনপিদলীয় আইনজীবীরা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তারা। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। আদালত তার স্বাস্থ্য রিপোর্ট পড়ে সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। বিএসএমএমইউর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল, খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে।

এদিকে তিন মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় খালেদা জিয়ার জামিন খারিজ হওয়ার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় চেয়ারপারসনের মুক্তি আর সম্ভব নয়।

আবেদনের বিষয়ে জানা নেই- মির্জা ফখরুল : গতকাল গাজীপুর জেলার নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির নেতাকর্মীদের নিয়ে শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিষয়টি তার জানা নেই।’

খালেদা জিয়ার মুক্তির আবেদনে কী লেখা রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমি ঠিক বলতে পারব না। পরিবারের পক্ষ থেকে করা হলেও হতে পারে। আবেদনে কী আছে আমার জানা নেই।’

সরকারের পক্ষ থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে প্যারোলের আশ্বাস দেওয়া হয় তাহলে বিএনপি বিষয়টি বিবেচনা করবে কি না জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা বহুবার বলেছি, এটা (প্যারোল) সম্পূর্ণভাবে তার (খালেদা জিয়া) ব্যক্তিগত ব্যাপার, ম্যাডামের ব্যক্তিগত ব্যাপার, তার পরিবারের ব্যাপার। সে ক্ষেত্রে আমরা এখন কিছু বলছি না।’

পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদনটি বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবেন কি না এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এটা তো তার পরিবার জানিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিইনি।’

দুই মামলায় সাজা নিয়ে দুই বছর ধরে কারাবন্দি খালেদা জিয়া গত প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ৭৫ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তার মুক্তি দাবি করে আসছে বিএনপি ও তার পরিবারের সদস্যরা।

গত শনিবার হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখে এসে বোন সেলিমা ইসলামের শঙ্কা প্রকাশের পরদিনই জানা গেল তার মুক্তির আবেদনের বিষয়টি। খালেদা জিয়ার জামিন না হলেও দুই মামলায় আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমের জামিনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা অনেক দিন থেকে বলে আসছি যে, এই রাষ্ট্র বর্তমানে অকার্যকর রাষ্ট্র হয়ে গেছে, এটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। যার ফলে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানে এখন কোনো শৃঙ্খলা-জবাবদিহিতার জায়গা নেই।’

তিনি বলেন, ‘এ কারণে আজকে একজন কুখ্যাত আসামি, যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং যার কাছে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গেছে। বেআইনিভাবে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে অথচ রাষ্ট্র জানে না। এতে প্রমাণিত হয়েছে এ রাষ্ট্র একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং সরকার ব্যর্থ হয়েছে দেশে একটা প্রাতিষ্ঠানিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা পেয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে আছেন খালেদা জিয়া। এরপর গত বছর ১ এপ্রিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন তিনি।