গত ক’দিন ধরে প্রচার মাধ্যম পাপিয়াময়। কেউ লিখছেন পাপিয়ার পাপের কাহিনী, কেউ বা বলছেন পাপিয়ার পাপের সাম্রাজ্য। প্রচার মাধ্যমে কিছু কিছু ছবি বেরিয়েছে যা দেখে সেই পুরনো কথাই নতুন করে বলতে হয়, ‘Truth is stranger than fiction’। সত্যিই এটা কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর। তা না হলে ২৮/২৯ বছরের একজন তরুণী মাত্র ৯/১০ বছরে নামে-বেনামে শত কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হলেন কীভাবে? অনেকেই ভাবছেন, নারী বলেই কি এত অপপ্রচার? পুরুষের অপরাধ হলে কি তোলপাড় হয়? সাধারণভাবে দেখা যায়, জন্মসূত্রে সম্পদের মালিক কেউ কেউ হন, প্রাণান্ত পরিশ্রম করেও কেউ কেউ কিছু সম্পদ সৃষ্টি করেন, নিজের মেধাকে বাণিজ্যের কাজে সর্বোত্তম ব্যবহার করে সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকেই, কেউ আবার বাতাস অনুযায়ী পাল তুলে নৌকা ভর্তি সম্পদ নিয়ে তর তর করে এগিয়ে গেছেন। তাদের সম্পদ ও শ্রীবৃদ্ধি দেখে অনেকের চোখ টাটায়, অনেকে দুঃখ পান, কেউ কপাল চাপড়ে বলেন, সবই কপাল, ভাই সবই কপাল! কিন্তু পাপিয়ার সম্পদ ও ক্ষমতা দেখে এ-কথা নিশ্চয়ই বলার উপায় থাকবে না। ২০০৮ থেকে ২০১৯ এই এক দশকে কী ভীষণ সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি সাজিয়েছিলেন তার সাম্রাজ্য। নরসিংদীর একটি কলেজ পড়–য়া সাধারণ মেয়ে কী অসাধারণ দক্ষতায় নাচতে এবং নাচাতে পারলেন সমাজের বাঘা বাঘা মানুষদের। ক্ষমতার আশ্চর্য জাদু আর মোহিনী মায়ায় কেমনে বশীভূত হলো এত সব রথী-মহারথী আর বিপুল হয়ে উঠল তার সম্পদের পাহাড়, তা সমাজ বিশ্লেষকদের গবেষণার খোরাক যেমন জোগাবে, মনস্তাত্ত্বিকদেরও সহায়তা করবে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে। পুঁজিবাদ সবকিছুকেই যে পণ্য করে সে সম্পর্কিত নতুন নতুন তথ্য ও উপাদান দেবে। যাক! এসব তো হলো জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণার কথা। এবার প্রয়োজনীয় কথায় আসা যাক!
মেয়েদের নিয়ে গল্প-কেচ্ছা বা কুৎসায় মানুষের উৎসাহের কমতি নেই। পাপিয়াকে নিয়ে যত প্রচার হয় তা দেখে কি মনে হয় না মানুষ এই সব খবরকে যতটা মুখরোচক সংবাদ হিসেবে দেখে ততটা বেদনা বা ঘৃণা অনুভব করে না। পাপিয়া নামক এই ফল কোন বৃক্ষের এবং কাদের পরিচর্যায় এত বড় হয়ে উঠল তা কি আমাদের ভাবনায় আসবে না। ফল কেউ ছিঁড়ে নিতে পারে অথবা পেকে ঝরে যেতে পারে কিন্তু বৃক্ষ যদি অটুট থাকে আর নিয়মিত পরিচর্যা পায় তাহলে তো আরও ফলভারে সজ্জিত হয়ে উঠবে তা। নতুন ফলের স্বাদ গন্ধে ভুলে যাবে পুরনো ফলের বেদনা। ক্ষমতার আশপাশে থেকে আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এমন অনেকের নাম আমাদের জানা হলো অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। সম্রাট, জিকে শামিম, খালেদ মাহমুদ, পি কে হালদার, আব্দুল হাই কত নাম, থোকা থোকা, গুচ্ছ গুচ্ছ নাম। কালের পরিক্রমায় ১০ বছর খুবই কম সময়। মনে হয়, এই তো সেদিন! কিন্তু সেদিন আর এই দিনের মধ্যে কত তফাৎ হয়ে যায় ক্ষমতার ছোঁয়া পেলে। জনগণের অবস্থার তেমন বদল না হলেও কিছু মানুষের ভাগ্য যে অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায় তার সর্বশেষ নিদর্শন পাপিয়া। তবে নিশ্চিত থাকুন এটাই শেষ নয়, আরও আছে।
পাপিয়ার কললিস্ট নাকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে পাপিয়ার কললিস্টে ১১ জন মন্ত্রী ও ৩৩ জন সংসদ সদস্যের নাম পাওয়া গেছে। অন্য অনেকের মতো এবার কিন্তু পাপিয়াকে বহিরাগত বলে চিহ্নিত করা বা পাশ কাটানোর কোনো উপায় নেই। কলেজ ছাত্রলীগ নেত্রী থেকে জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদিকা পর্যন্ত উত্তরণে দলের নেতাদের আশীর্বাদ কাজ করেছে এবং বিগত ১১ বছর তিনি যে দলটি করতেন তারা টানা ক্ষমতায় রয়েছে। বরং এই ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে যে, জেলা নেতাদের পরামর্শে নয় কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পাপিয়া জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদিকা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তা কেন্দ্র কেন এত গুরুত্ব দিল তাকে? দলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে তার ছবি এবং অন্তরঙ্গতা দেখে সাধারণ কর্মীদের ভিরমি খাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। বড় নেতাদের সঙ্গে ছবি কর্মীদের থাকতেই পারে। সেটা হতে পারে শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসার নিদর্শন। কিন্তু ক্ষমতার এমন এক মোহ আছে এবং সংক্রামক ক্ষমতা আছে যে, ক্ষমতাসীন কারও সঙ্গে ছবি থাকা মানে দাঁড়ায়, আমাকে চেনো? আমাকে অমুক অমুক স্নেহ করে। এটা যে কত বড় পুঁজি তা দ্রুততম সময়ে ধনী হওয়া ব্যক্তিদের দিকে তাকালে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। নারী হওয়ায় সম্ভবত পাপিয়ার ক্ষেত্রে এটা নতুন মাত্রা নিয়েছিল। রথী-মহারথীরা তার কাছে ছুটে যেতেন। মানুষকে উদ্দাম করার, উন্মাদ করার, ভেতরের নোংরামিকে বের করে এনে তাকে বশীভূত করা বা ব্ল্যাকমেইল করার সব কায়দাই জানা ছিল তার। তার এই জালে ধরা পড়েছে অনেকেই। এদের পোষা হাতির মতো ব্যবহার করে বন্যহাতি ধরার পদ্ধতি তৈরি করেছিল সে। অভাবের কশাঘাতে, আর প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে তার সহযোগী নারীরা ব্যবহৃত হয়েছে নতুন নতুন পয়সা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের কাজে। যারা এই কাজে নিয়মিত যেতেন, তারা নাকি চেষ্টা-তদবির করছে যেন তাদের নাম প্রকাশ না হয়। অভিজ্ঞতা বলে, কললিস্টের নাম প্রকাশ বন্ধ করতে গিয়ে আরও অনেকের অনেক টাকার লেনদেন যে হবে তা নিশ্চিত।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাঁচতারা হোটেলের ভূমিকা বাড়ছে দিন দিন। সমাজের ক্ষমতাশালীরা যা কিছু পরিকল্পনা করছে, তার সবই দেখি হচ্ছে এখন সব নামিদামি পাঁচতারা হোটেলে। এক পাঁচতারা হোটেলে বসে প্রাইভেট ব্যাংক মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে নির্ধারণ করা হয়েছে ঋণখেলাপিদের সুবিধার পরিমাণ ও শর্ত। পত্রিকায় এসেছে এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের খসড়াও নাকি তৈরি হয়েছে পাঁচতারা হোটেলে বসে। অন্যদিকে, পাপিয়ার আনন্দমহল হিসেবেও নাম এসেছে এক বিখ্যাত পাঁচতারা হোটেলের। পাপিয়া ১২৯ দিনে পরিশোধ করেছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার বিল। প্রতিদিন হোটেলের বারে আড়াই লক্ষ টাকার বিল পরিশোধ করা দেখে শুধু আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয় না, এই প্রশ্নও তো জাগে, এই পরিমাণ মদ খেতে কত সম্মানিত অতিথিকে কষ্ট করে এবং সময় নষ্ট করে হোটেলে যেতে হয়েছে? লাঠি হাতে সর্দারনীর ভূমিকা, সুইমিং পুলে সখী পরিবেষ্টিত হয়ে আনন্দ স্নানের দৃশ্য, আর ধনবান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার ছবি প্রচার মাধ্যমে দেখেছেন অনেকেই। যারা একটু যুক্তি বা নীতির কথা ভাবেন, তাদের মাথায় একটা ভাবনাই বারবার শুধু আসতে পারে, কেমন করে সম্ভব এ ক্ষমতা আর বিলাসবহুল জীবন? এত সুরক্ষিত, নজরদারিতে রাখা বিলাস ও ব্যয়বহুল হোটেলে এসব ঘটতে পারে, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও নিরাপত্তা প্রহরীদের নজর এড়িয়ে দিনের পর দিন? সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার কথা বলছি তো ক্লান্তিহীনভাবে। কিন্তু সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে যে আছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ পাপিয়া এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের আয় কীভাবে উপার্জিত, সংবিধানের ধারক হিসেবে যারা নিজেদের দাবি করবেন তাদের সবাইকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি কি হতে হবে না?
পাপিয়াদের গ্রেপ্তারের কি কোনো ইতিবাচক দিক নেই? অবশ্যই আছে। তবে তা অনেকটা মাছ চাষ করে বছরে একবার বড়শি প্রতিযোগিতা করে জলাশয় থেকে বড় ও ছোট মাছ থেকে ধরার মতো। ব্যাপক আয়োজন করে মাছ ধরা হয়, বড় মাছ ধরার পুরস্কারও অনেকে পান, কিন্তু মাছ চাষ অব্যাহত থাকলে পুকুর আবার মাছে ভর্তি হয়ে যায়। বাংলাদেশ নামক এই পুকুরে দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নের যে মাছ চাষ হচ্ছে সেখান থেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে পুকুরকে মাছশূন্য করা যাবে না, বরং সুযোগ না পাওয়া মাছেরা বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। ধরা পড়ায় পাপিয়া এখন একা এবং নিঃসঙ্গ। যাদের হাত ধরে এবং যাদের ওপর নির্ভর করে পাপিয়ার উত্থান তারা বহাল তবিয়তে থাকলে, নতুন পাপিয়ার উত্থান ঘটতে বেশি সময় লাগবে না। এক পাপিয়া যাবে, কিন্তু পাপিয়াদের রাজনীতি বহাল থাকলে পাপিয়ারা আসতেই থাকবে। যে দেশে গার্মেন্টসের শ্রমিক যাদের বেশিরভাগ নারী তাদের ১০ জনের ৯ জন তিন বেলা পেট ভরে পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না, সে দেশে এই পাপিয়ারা যে চিত্র তুলে ধরে তা উন্নয়ন না অধঃপতনের, তা ভাবার প্রয়োজন আছে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com