পদ্মায় নৌকাডুবি ভেসে উঠল বেনারসি জড়ানো পূর্ণির লাশ

নববধূ পূর্ণির হাতে মেহেদির রং, গায়ে গহনা, পায়ে নূপুর আর পরনে লাল বেনারসি জড়ানো। নববধূর সব অনুষঙ্গ থাকলেও দেহটা নিথর। গতকাল সোমবার মরদেহ উদ্ধারের সময়ও পূর্ণির শরীরে জড়ানো ছিল বিয়ের লাল বেনারসি। রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুরে পদ্মা নদীতে  গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বর-নববধূবাহী দুটি নৌকাডুবির পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন নববধূ সুইটি খাতুন পূর্ণি (১৮)। পরে গতকাল সকাল ৭টার দিকে শ্যামপুর ঘাট এলাকায় তার মরদেহ খুঁজে পান স্থানীয় জেলেরা। এর আগে গেল তিন দিনের উদ্ধার অভিযানে আটজনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নিখোঁজ ছিলেন পূর্ণি। এ নিয়ে ওই নৌকাডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল নয়জন। নববধূ পূর্ণির মরদেহ পাওয়ার পর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবারই নববধূ বেশে স্বামীর বাড়ি গিয়েছিলেন পূর্ণি। পরদিন শুক্রবার সেখানে বউভাতের অনুষ্ঠান শেষে স্বামী ও স্বজনদের সঙ্গে ফিরছিলেন বাবার বাড়ি। কিন্তু ফেরা আর হলো না। ফিরলেন লাশ হয়ে। এখনো হাতের মেহেদির রংই শুকোয়নি পূর্ণির। লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়িটিও জড়ানো রয়েছে পরনেই। নতুনভাবে জীবনটা শুরুর আগেই নববধূ পূর্ণি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। পূর্ণি রাজশাহীর পবা উপজেলার ডাঙেরহাট গ্রামের শাহীন আলীর মেয়ে।

রাজশাহী সদর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে জানান, নববধূ পূর্ণির মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তাদের চার দিনের উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। পদ্মায় গত ৬ মার্চ নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ নয়জনের মধ্যে শুধু পূর্ণিরই খোঁজ মিলছিল না। দুর্ঘটনার পর বিভিন্নভাবে উদ্ধার হয়ে এসেছেন নৌকাটির মোট ৩৩ আরোহী। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই দুর্ঘটনা : অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই বর-নববধূকে বহন করা নৌকা দুটি ডুবেছে বলে চিহ্নিত করেছে এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠন করা তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু আসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছোট ওই ডিঙ্গি নৌকা দুটিতে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠার ফলেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাঝনদীতে হালকা ঝড়ের কবলে পড়েই পরপর দুটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। ওই দুই নৌকার মাঝি বা নৌকার যাত্রীদের কারো কাছেই লাইফ জ্যাকেট ছিল না। তাই ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য মাছ ধরার নৌকা, যাত্রীবাহী নৌকা ও প্রমোদতরী আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে নৌকার মাঝির বয়স নির্ধারণ করে দেওয়াসহ প্রতিটি নৌকায় যাত্রী ধারণক্ষমতা লিখে দেওয়ারও সুপারিশ করা হচ্ছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।’

এদিকে নৌকাডুবির ঘটনা নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক হামিদুল হক। এ সময় তিনি বলেন, ‘মাছ ধরার ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত (৮-১০ জনের স্থলে ২০-২২ জন) যাত্রী উঠেছিল। মাঝপথে আকস্মিক বিরূপ আবহাওয়া দেখা দেয়। হঠাৎ তীব্র স্রোত এবং বিপরীতমুখী ঝড়ো বাতাসের কারণে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয় মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিজিবি, বিআইডব্লিউটিএ ও স্থানীয় জেলেরা।’

পদ্মার ওপারের পবা উপজেলার চরখিদিরপুর এলাকার ইনসার আলীর ছেলে আসাদুজ্জামান রুমনের সঙ্গে একই উপজেলার ডাঙেরহাট এলাকার শাহীন আলীর মেয়ে সুইটি খাতুন পূর্ণির বিয়ে হয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বউভাত অনুষ্ঠান শেষে বর-নববধূসহ ৪২ জন যাত্রী নিয়ে দুটি নৌকা কনেপক্ষের বাড়িতে ফিরছিল। পথে নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় দুটি নৌকাই ডুবে যায়। পরে বর রুমনসহ নৌকা দুটির ৩৩ আরোহী জীবিত উদ্ধার হয়। সন্ধ্যার পর থেকেই ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ, নৌপুলিশ ও বিজিবি এবং স্থানীয় জেলেরা উদ্ধারে নামে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধারকাজের তদারকি করা হয়। শুক্রবার রাতে একজন, পরদিন পাঁচজন এবং গত রবিবার দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।