থাইল্যান্ডে অবস্থানরত বাংলাদেশের আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নরসিংদী যুব মহিলা লীগের আলোচিত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়ার। আজিজ মোহাম্মদ ভাই পাপিয়ার ব্যাংকক ও পাতায়ার দুটি বারে নিয়মিত যেতেন। পাপিয়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে অন্তত পাঁচ বছর তাদের মধ্যে এমন যোগাযোগ ছিল। পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানা গেছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন জালমুদ্রা কারবারে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুদ্রা পাচারকারীদের সঙ্গে ‘লিয়াজোঁ করে’ দেশ-বিদেশে মুদ্রা পাচার করে আসছিলেন তারা। ওইসব পাচারকারীরও নাম জানিয়েছেন তারা।
পাপিয়া ও সুমন চৌধুরীর অর্থের তথ্য জানাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) দেশি-বিদেশি ৫৯টি ব্যাংকে গত রবিবার চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালের শেষদিকে এফডিসিতে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে পাপিয়ার যোগাযোগ হয়। তারপর থেকেই পাপিয়া ও সুমন অপরাধ জগতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এমনকি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের পরামর্শে ব্যাংকক ও পাতায়ায় দুটি বার খুলে বসেন পাপিয়া। মাঝেমধ্যে আজিজ মোহাম্মদ ঢাকায় এলে পাপিয়া তার সঙ্গে দেখা করতেন। গ্রেপ্তারের পরপরই র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও সুমন স্বীকার করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই নানা অপকর্মে জড়িত। নারী ব্যবসার পাশাপাশি জালমুদ্রার কারবারে জড়িত। অস্ত্রের কারবার, চোরাচালানের পাশাপাশি ‘মোটা অঙ্কের’ অর্থের বিনিময়ে জমিদখলও করে দিতেন। তারা এসব কারবার চালিয়ে দুটি হাইস মাইক্রোবাস, একটি নোহা ও একটি ভেজেল কার ক্রয় করেছেন।
রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার একটি ফ্ল্যাটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেয়ারটেকার জানান, প্রায়ই রাত ১২টা-১টার দিকে সাত-আটজন নারী নিয়ে বাসায় আসতেন পাপিয়া ও সুমন। কোনো দিন নিজের গাড়ি নিয়েই আসতেন, আবার কোনো দিন অন্য কেউ এসে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। যেদিন রাতে আসতেন সেদিন রাতে থেকে পরের দিন দুপুরে চলে যেতেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়া ও তার স্বামীসহ গ্রেপ্তার চারজন অধিকাংশ সময় রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করতেন। তবে পাপিয়ার স্বামী সুমন চৌধুরী বেশিরভাগ সময় থাইল্যান্ডে থাকতেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাপিয়াসহ চারজনকে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেয় আদালত। পাপিয়া ও সুমন ১৫ দিনের রিমান্ডে আছেন। আবারও তাদের রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা নিয়মিত বিদেশ থেকে মদের চালান নিয়ে আসতেন। পাপিয়ার সব কর্মকা-ের অন্যতম অংশীদার তার স্বামী সুমন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাপিয়া জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংককে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পাপিয়া কীভাবে টাকা দেশ থেকে পাচার করেছেন সে কথা জানতে এবং ওই টাকা দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে কাজ করছে সিআইডির মানি লন্ডারিং বিভাগ। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডিও পাপিয়াকে মামলার পর রিমান্ডে নিতে পারে।
পাপিয়ার মানি লন্ডারিংয়ের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সিআইডি অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে বলে জানান এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের পর যদি তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পাপিয়ার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য জানতে ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই পুরো তথ্য হাতে আসবে বলে আশা করছি। তারপরই মামলা হবে।
জাল টাকা বহন ও টাকা পাচারের অভিযোগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে পাপিয়া (২৮) ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী (৩৮) এবং তাদের দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবাকে (২২) গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড ও নরসিংদীতে অভিযান চালায়। অভিযানে ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়। পরদিন বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি ও ২৪ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি পাপিয়া-সুমন দম্পতির অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদকও।