সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পেনশন বৈষম্য

ছুটি নগদায়ন মঞ্জুরির আদেশ বিল দাখিলের তিন দিনের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনের টাকা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে। মাসিক সুবিধার টাকা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।  ‘পিআরএল’ শেষে পরদিনই তাদের গ্র্যাচুইটির সমুদয় টাকার চেক প্রদান করা হবে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। অবসরগ্রহণকারী সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির বিল পেতে আগে অনেক সমস্যা হতো। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয়ে যেত। বর্তমান সরকারের এ পদক্ষেপের ফলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের অবসর-উত্তর পাওনা পাওয়ার পথ সুগম হবে। কষ্ট লাঘব হবে। সমাজ গড়ার কারিগর প্রবীণেরা জীবনের শেষ দিনগুলো একটু ভালোভাবে কাটাতে পারবেন। যেসব সরকারি কর্মচারী ইতিপূর্বে শতভাগ পেনশনের টাকা উত্তোলন করেছিলেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মানবিক কারণে তাদের পুনরায় পেনশন প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সরকারের এসব কাজ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। সরকারের এই প্রবীণবান্ধব পদক্ষেপ অভিনন্দনযোগ্য।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা কোনো অংশেই কম নয়। তারা প্রচলিত নিয়ম-কানুন মেনে দেশের উন্নয়নে কাজ করেন। জনগণের সেবা প্রদান করেন। যৌবনের দুরন্ত দিনগুলো উৎসর্গ করেন দেশের কাজে। সমাজের কল্যাণে। দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়ে একসময় স্বাভাবিক নিয়মে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু পেনশনের নিয়ম-কানুন ও সুযোগ-সুবিধায় আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পেনশনাররা তুমুল বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এখানে একটি বড় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরছি।   

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন’ একটি  সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এই করপোরেশনের অধীনে ১৫টি চিনিকল ও একটি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা রয়েছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চিনিকলগুলোই একমাত্র কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। কৃষক তাদের উৎপাদিত আখ সরকার নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি সরবরাহ করেন চিনিকলে। চিনিকলের কৃষি বিভাগ আখচাষিদের  ঋণের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার ও বালাইনাশক সরবরাহ  করে এবং আখ চাষের আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগে চাষিদের সহায়তা প্রদান করে। এছাড়া চিনিকলগুলো মিল এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করে। আখচাষিদের মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান করে। আখের মূল্য ও শ্রমিক কর্মচারীদের বেতনভাতা বাবদ কোটি কোটি টাকা প্রদান করে। ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আবর্তিত হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। ভোক্তাদের মধ্যে চিনির মূল্য সহনশীল পর্যায়ে রাখতে চিনিকলগুলোর অবদানও কম নয়।

এক সময় চিনিকলগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। ভ্যাট, কর হিসেবে কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিত। আখের মূল্য প্রদান, সার, কীটনাশকসহ উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহ এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবসর-উত্তর পাওনা পরিশোধের জন্য সরকারের ওপর নির্ভর করতে হতো না। এখন সেই অবস্থা নেই। কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ছাড়া প্রতিটি চিনিকলে প্রতি বছর লোকসান হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। লোকসানের প্রধান কারণগুলো হলো দীর্ঘমেয়াদি ফসল চাষে কৃষকের অনীহা, আগাম আখের অভাব, উচ্চ চিনি আহরণযুক্ত জাতের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আখের সংকট, মিলজোন এলাকায় অবৈধভাবে পাওয়ার ক্রাশারের মাধ্যমে গুড় তৈরি, আখ ক্রয় কাজে অনিয়ম, সময়মতো আখের মূল্য পরিশোধ না করা, অব্যবস্থাপনা, পুরাতন জীর্ণ যন্ত্রপাতি, চিনি আহরণ হার কম এবং উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে চিনি বিক্রি ইত্যাদি।

আখের অভাবে ইতিমধ্যে ১২টি চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে চিনিকলগুলো চাষিদের আখের মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না। এ নিয়ে চাষিদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আখের পরিচর্যা, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনের এখনই উপযুক্ত সময়। আখের মূল্য না পেলে কী দিয়ে কৃষক করবে এসব কাজ? সময় মতো পরিচর্যা না হলে  আখের ফলন ও গুণগত মান হ্রাস পাবে। এতে  হ্রাস পাবে আগামী বছর চিনি উৎপাদনের পরিমাণ। জানা মতে, রংপুর চিনিকলে আখচাষিদের পাওনা রয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সব চিনিকলে এই পাওনার পরিমাণ হবে ১৫০ কোটি টাকার ওপর। শুধু আখচাষিদের পাওনা নয়; অর্থের অভাবে শ্রমিক-কর্মচারীরা গত দু’মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আর চিনিকলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের কষ্টের কথা তো বলে শেষ করা যাবে না। সরকারি কর্মচারীদের মতো তাদের  কোনো পেনশন নেই। নেই অন্য কোনো আয়ের উৎস। চাকরি থেকে অবসরের ৩/৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তারা পাচ্ছেন না গ্র্যাচুইটির বিল। বৃদ্ধ বয়সে অর্থের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ও ওষুধ কিনতে পারছেন না।  সন্তানদের পড়াশোনার খরচও বহন করতে পারছে না কেউ কেউ। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়, হতাশায় দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। কী দুর্ভাগ্য! ছেলেময়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছেও তারা হয়ে পড়ছেন অবহেলা ও অবজ্ঞার পাত্র। বাংলাদেশের মতো একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মচারীদের প্রতি কেন এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা হবে? কেন এই অসহায় বৃদ্ধ মানুষগুলোকে অযথা কষ্ট দেওয়া হবে?

একই মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ও বিটাকের কর্মচারীরা যদি সময় মতো গ্র্যাচুইটির অর্থ, বছরে দু’টি উৎসব বোনাস ও বৈশাখী ভাতা পান, তাহলে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কর্মচারীরা পাবেন না কেন? উদাহরণ হিসেবে নিজের কথাই বলি ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে আমি  নর্থবেঙ্গল সুগার মিল থেকে জিএম (কৃষি) হিসেবে অবসর গ্রহণ করি। অবসরগ্রহণের তিন বছর পরও গ্র্যাচুইটির সম্পূর্ণ টাকা পাইনি। টাকার অভাবে নিজের ও মেয়ের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। আমার মতো এরকম শত শত কর্মচারী গ্র্যাচুইটির বিল পাচ্ছেন না। এক সঙ্গে গ্র্যাচুইটির টাকা পেলে সঞ্চয়পত্র কিনেও আমরা কোনোরকমে বেঁচে থাকতে পারতাম। জটিল জীবনযন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতাম। একই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন করপোরেশনের মধ্যে এত বৈষম্য কেন? সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য করপোরেশন, ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা যদি অবসর গ্রহণের পর সময় মতো সব পাওনা পেতে পারেন, তাহলে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কেন পাবেন না? প্রবীণ নাগরিক হিসেবে অবসর-উত্তর ন্যায্য পাওনা সময়মতো পাওয়ার অধিকার কি তাদের নেই? বিগত সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রবীণদের কল্যাণের অনেক অঙ্গীকার করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল। অর্থমন্ত্রী মহোদয় সর্বজনীন পেনশন চালু করতে চান। সবাইকে নিয়ে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করতে চান। তাহলে আমাদের এই  জীবন-মরণ সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন? এই অসহায় প্রবীণদের ব্যাপারে শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কি কোনো দায়িত্ব নেই? দায়িত্ব নেই করপোরেশনের? যারা সারাটা জীবন দেশের কাজে, কৃষকের কল্যাণে শ্রম দিল, মেধা দিল, বুদ্ধি দিল অবসরপ্রাপ্ত সেই প্রবীণদের প্রতি কি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এত অবহেলা কেন? এ বড়ই অসম্মানের ও লজ্জার বিষয়।

লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড

netairoy18@yahoo.com