চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত একক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কাউন্সিলর পদে ১৭ জন বর্তমান কাউন্সিলর বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এরমধ্যে অনেকেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুসহ নানা অভিযোগে এলাকাবাসীর কাছে বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালত ও থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। যারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগের সমর্থন থেকে ছিটকে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় হাই কমান্ড রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও নানা কৌশল অবলম্বন করেও এসব বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করাতে না পারায় ‘বেকায়দায়’ পড়েছেন দলের সমর্থন পাওয়া অধিকাংশ প্রার্থী। তবে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হবেন, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলের চসিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এরপরও বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে গত সোমবার বিকেল থেকে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে প্রচারণাও শুরু করেছেন।
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান ১২ কাউন্সিলর। তারা হলেন- ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের তৌফিক আহমেদ চৌধুরী, ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাহেদ ইকবাল বাবু, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জহুরুল আলম জসীম, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের মোরশেদ আক্তার চৌধুরী, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডের সাবের আহমেদ, ১৪ নম্বর লালখানবাজার ওয়ার্ডের আবুল ফজল কবির আহমদ ওরফে এফ কবির মানিক, ২৫ নম্বর রামপুরা ওয়ার্ডের এস এম এরশাদ উল্লাহ, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এইচএম সোহেল, ২৮নং পাঠানটুলী ওয়ার্ডের আব্দুল কাদের, ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডের তারেক সোলায়মান সেলিম, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের হাসান মুরাদ বিপ্লব এবং ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডের মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী।
অন্যদিকে দলের সমর্থন থেকে ছিটকে পড়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ জন বর্তমান কাউন্সিলর। তারা হলেন- ৪ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (৯, ১০ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড) আবিদা আজাদ, ৭ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (১৬, ২০ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ড) আনজুমান আরা বেগম এবং ৯ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (১২, ২৩ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড) ফারহানা জাবেদ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫ মার্চ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে ‘সমঝোতা বৈঠক’ করেছিলেন চসিক নির্বাচনে দলের সমন্বয়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরা অনড় থাকায় বৈঠক ভেস্তে যায়। পরবর্তী সময়ে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজ বাসভবনে ডেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চাপ দেন। এছাড়াও দলীয় সিদ্ধান্ত মানাতে কৌশলে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও সাংসদ ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও বিদ্রোহীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। এরপরও বিদ্রোহীদের মন গলেনি। পরবর্তী সময়ে তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে গত রবিবার কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের চসিক নির্বাচনে দলের বিদ্রোহীদের দমাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
বৈঠকের পর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিনে সাধারণ কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহী ৫০ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। পরবর্তী সময়ে বিকেলে মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যোগ দেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ একাধিক নেতা। সভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছেন, তাদের বহিষ্কার করা হবে।’
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ৫টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী থাকলেও বাকি প্রায় সব ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এরমধ্যে ১৫ জন বর্তমান কাউন্সিলর বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৫টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা হলেন- ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর, ২১ নম্বর জামালখান, ২৩ নম্বর পাঠানটুলি, ৩৫ নম্বর বকশিরহাট, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চসিকের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তৌফিক আহমদ চৌধুরীকে বাদ দিয়ে এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া হয়েছে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী মো. শফিউল আজিমকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তৌফিক। অথচ তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং তৈরি করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো, মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসী কাজে ভাড়া দেওয়াসহ নানা অভিযোগ থাকায় তাকে আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া হয়নি। এরপরও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তৌফিক। এলাকাবাসীর অভিযোগের পাশাপাশি তৌফিক নিজেও হলফনামায় তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবালকে বাদ দিয়ে এবার দলের সমর্থন দেওয়া হয়েছে মহানগর যুবলীগের সদস্য মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে সাহেদ ইকবাল নির্বাচন করছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে এলাকায় নিজস্ব বলয় তৈরি করে সন্ত্রাসী কর্মকা-, দখলবাজি, চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকায় এবার তাকে দলের সমর্থন দেওয়া হয়নি। এলাকাবাসীর নানা অভিযোগের পাশাপাশি হলফনামায় তার বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানায় একটি মামলা থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে দলের সমর্থন পাওয়া মোহাম্মদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধেও এলাকায় নিজস্ব বলয় তৈরি করে ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।
অন্যদিকে ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. জহুরুল আলম জসিমকে বাদ দিয়ে দলের সমর্থন দেওয়া হয়েছে পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আবছার মিয়াকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জসিম। অথচ তার বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক কারবার, দখলবাজি, পাহাড় কেটে সরকারি খাস জায়গা অবৈধভাবে বিক্রি, অটোরিকশা ও বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ থাকায় এবার তাকে আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া হয়নি। এরপরও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জসীম। এলাকাবাসীর অভিযোগের পাশাপাশি জসীম নিজেও হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ আইন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, পরিবেশ আদালত আইনসহ নানা অপরাধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত এবং পাহাড়তলী ও খুলশী থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি মামলায় তিনি আদালত থেকে খালাস পেলেও বেশিরভাগ মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। এছাড়াও কাউন্সিলর হওয়ার পর ‘শত কোটি টাকার মালিক’ বনে যাওয়া এই জসীমের বিরুদ্ধে এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে ত্রাস সৃষ্টি করারও অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।
১৪ নম্বর লালখানবাজার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আবুল ফজল কবির আহমেদ ওরফে এফআই কবির মানিককে বাদ দিয়ে সমর্থন দেওয়া হয়েছে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবুল হাসনাত মো. বেলালকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মানিক। অথচ তার বিরুদ্ধে এলাকায় পাহাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে ত্রাস সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তবে এই ওয়ার্ডে দলের সমর্থন পাওয়া বেলালের বিরুদ্ধেও এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করার অভিযোগ করছেন অনেকে।
২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. আবদুল কাদের ওরফে মাছ কাদেরকে বাদ দিয়ে দলের সমর্থন দেওয়া হয়েছে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম বাহাদুরকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কাদের। অথচ তার বিরুদ্ধে এলাকায় নিজস্ব বলয় তৈরি করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের পাশাপাশি আবদুল কাদের হলফনামায় তার বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা বিঘœকারী অপরাধ, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল, জিআর মামলাসহ নানা অভিযোগে ২৮টি মামলা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে জননিরাপত্তা মামলায় উচ্চ আদালতের সাজার বিপরীতে জামিনে থেকে আপিল শুনানির অপেক্ষা রয়েছেন এবং অন্য মামলাগুলো প্রত্যাহার ও খালাস হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লবকে বাদ দিয়ে দলের সমর্থন দেওয়া হয়েছে মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে। এরপরও দলের সিদ্ধান্ত না মেনে নির্বাচন করছেন বিপ্লব। অথচ তার বিরুদ্ধে এলাকায় নিজস্ব বলয় তৈরি করে ত্রাস সৃষ্টি, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে তাকে এবার দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের পাশাপাশি হলফনামায় তার বিরুদ্ধে ডবলমুরিং থানায় একটি মামলার কথা উল্লেখ রয়েছে।