খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রখ্যাত পশ্চিমা তাত্ত্বিক আব্রাহাম মাসলো তার প্রখ্যাত ‘নিডস থিওরি’ বা ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্বে’ মানুষের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি স্তরের কথা বলেছেন। সেখানে তিনি প্রথম স্তরে রেখেছিলেন শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনের কথা যার মধ্যে বাতাস, পানি, খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক এবং জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় স্তরে তিনি বলেছেন নিরাপত্তার কথা যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্পদ, স্বাস্থ্য, চাকরি ইত্যাদিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তৃতীয় স্তরে তিনি রেখেছেন পরিবার, বন্ধুত্ব, ব্যক্তির একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাকে। চতুর্থ স্তরে তিনি স্থান দিয়েছেন শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসম্মান, মর্যাদা, স্বীকৃতি ও স্বাধীনতাকে। সবার শেষে তিনি বলেছেন, ‘ব্যক্তির সম্ভাবনার বিবেচনা ও চাহিদা পূরণের সক্ষমতা নিরূপণের কথা’; ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘Self-Actualization’। যদিও এখন অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষক এই ধারণাকে ঠিক উল্টোভাবে দেখিয়েছেন যে মানুষের প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে ‘Self-Actualization’, যা মাসলোর ধারণার ঠিক উল্টো। আমি সেই বিতর্কে যাব না। কোনটি প্রথম প্রয়োজন কিংবা কোনটি শেষ প্রয়োজন।
মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছে। জলবায়ু ও ঋতুবৈচিত্র্যের সাপেক্ষে জীবনধারণ ও বসবাসের জন্য একটি সুষ্ঠু বাসস্থান সবারই প্রয়োজন। তবে এখন যে বিষয়টি স্থপতি-পরিকল্পনাবিদদের কাজে বেশি করে বিবেচিত হচ্ছে সেটি নিরাপদ বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা। নিরাপদ বাসস্থান কতটুকু প্রয়োজন, বিশেষ করে আমাদের সমাজের নারীদের জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে সেসব নারীর জন্য যাদের আয়-রোজগার খুব বেশি নয়। যারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কঠোর কায়িক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে, সংসার চালায়। তারা হয়তো ইচ্ছা করলেই নিজের পছন্দমতো বাসা পরিবর্তন করতে পারেন না। কিংবা সেসব গৃহিণী যারা গেরস্থালির নানা ধরনের কাজেই দিনমান ব্যস্ত থাকেন।
কিন্তু ‘নারীর জন্য নিরাপদ বাসস্থান’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? নানা তথ্য-উপাত্ত, পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় নারী ও পুরুষের
মন-মানসিকতা কিংবা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার দরুন তাদের চিন্তা-চেতনার কিছুটা বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য থাকে; এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে যে বহু নারী-পুরুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এবং দিন দিন যে দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সেটির সঙ্গে যে বাসস্থানের এক ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, তা হয়তো আমরা অনেক সময়ই খেয়াল করি না। নারীরা সব সময় সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। এ কারণে আলো-বাতাস ঠিকমতো আসতে পারে না এমন বাসস্থানে তারা খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তা ছাড়া প্রধানত শহরকেন্দ্রিক অ্যাপার্টমেন্টগুলোর ওপরের তলার বাসিন্দারা নিচের তলার বাসিন্দাদের থেকে বেশি মানসিক চাপ উপলব্ধি করেন। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এ ছাড়া বাসস্থানের রান্নাঘর ও টয়লেট নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন নারীরা। বাসস্থানের প্রতিটি অংশের সঙ্গে একজন নারীর থাকে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বাসস্থানের সঙ্গে নারীর মন-মানসিকতার এই মিথস্ক্রিয়া উপলব্ধি করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। নারীরা ঘরের প্রতিটি কোনায়, কোথায় কী আছে সেগুলো কীভাবে রাখলে সব থেকে ভালো থাকবে, এগুলো নিয়ে ভাবেন, এগুলো থাকে তাদের নখদর্পণে। ঠিক তেমনি বাড়ির কোথায় কী থাকা উচিত, কী হওয়া উচিত, সেসব নিয়ে তাদের ধারণা অনেকটাই বাস্তববাদী এবং বেশির ভাগ পুরুষের ধারণা থেকে আলাদা।
আবার সন্তানসম্ভবা কিংবা কিংবা বৃদ্ধ নারীর জীবনযাপনে বসতবাড়িতে বিশেষ প্রয়োজনীয়তাগুলো কেমন, সেগুলো পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন স্থপতিদের। কারণ এই নারীরা সব থেকে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন কোনো একটি স্থানে বসবাসের ক্ষেত্রে। তাদের নিত্যদিনের যাপনে অনেক প্রয়োজনীয়তা যেহেতু অন্যদের থেকে আলাদা, তাই সেসব পর্যায়ক্রমে উপলব্ধি করলে হয়তো আমাদের স্থাপত্য চর্চায় অনেক বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
আমরা অনেক সময় স্বাস্থ্যবান্ধব স্থাপনার কথা বলি, সবুজ স্থাপনার কথা বলি। কিন্তু এই স্বাস্থ্যবান্ধব এবং সবুজ স্থাপনা কখনো আমাদের এসব বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হবে না; যদি না সেখানে নারীর জীবনযাপনের বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত উপলব্ধিগুলো বিবেচনা করা না হয়। আমাদের এখনকার ‘ফ্ল্যাট-কালচার’-এ আমরা একে অপরের জীবন নিয়ে ভাবি না, এ কথা বহুভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। নারীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের স্বরূপ কী হতে পারে, এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন ছিল বহু আগেই। বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারীই এখন বাইরের কর্মব্যস্ত জীবন আর ঘরের কর্মব্যস্ত জীবন সামলাতে গিয়ে চিঁড়েচ্যাপটা হচ্ছে। নানা বিবেচনাতেই উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত নারীর জীবনের সংগ্রাম অনেক আলাদা। কিন্তু বাসস্থানে নারীর নিজস্ব প্রয়োজনীয়তাগুলোর বিবেচনায় উচ্চবিত্তরা অনেক এগিয়ে থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীর টানাপড়েন খুবই তীব্র। আবার নিজ নিজ শ্রেণি অনুসারে তাদের প্রয়োজন এবং মানসিক চাহিদাও হয়তো একে অপরের থেকে অনেক ভিন্ন। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীবান্ধব স্থাপত্যের রূপরেখা কী হবে বা কী হতে পারে, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এ বিষয়ে শুধু স্থপতিরা কাজ করলেই চলবে না, কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। কারণ সব নারীর জন্যই নিরাপদ ও নারীবান্ধব বাসস্থান এখন সময়ের দাবি।
প্রথমেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে একটি বসবাসের স্থানে নারীরা কী কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতাকে স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণায় কাজে লাগাতে হবে। বাসস্থানের এমন কিছু কিছু বিষয় আছে, যেগুলো হয়তো আমরা স্থপতিরা এযাবৎকাল আমাদের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে আনতে পারিনি। সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে এসব বায়োলজিক্যাল বিষয়গুলো আমাদের স্থাপত্যচর্চায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি স্থাপত্যের সঙ্গে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আর এ ক্ষেত্রে একটি পরিবারের নারী ও শিশুরা সব থেকে বেশি প্রভাবিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই এখন নারীবান্ধব স্থাপনা নিয়ে নানা পরিকল্পনা চলছে। এমনকি নারীরা কীভাবে তাদের বসবাসের জায়গায় ভালো থাকবে, নিরাপদ থাকবে, কীভাবে তাদের বসবাসের জায়গাগুলো নকশা হবে, সেগুলো নিয়ে অনেক দেশে অনেক ধরনের স্থাপনা নির্মাণের বিশেষ কোড বা বিধিমালা আছে। কারণ নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যেহেতু আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার, তাই বাসস্থানে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতকল্পে বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে এবং গুরুত্বসহকারে দেখা আমাদের দায়িত্ব। এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার পাশাপাশি সরকারেরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের দেশে জীবন-সংগ্রামে পিছিয়ে পড়া অনেক নারীই এখনো নিরাপদ বাসস্থানের অভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। কিন্তু বসবাসের জন্য, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ছোট্ট একটি বাসস্থানও একটি নারীকে আরও বেশি বলিষ্ঠ করে তুলতে পারে। তাই বাংলাদেশের সব নারীর জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়া, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের বন্দোবস্ত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ আসন্ন ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনে সরকার এ বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেবে কি?
লেখক : মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের পিএইচডি গবেষক, অস্ট্রেলিয়া
sajal_c@yahoo.com