সাদা পাঞ্জাবি-পাজামার ওপর কোটা হাতা কাটা কোট। দুপাশে দুই পকেট, বোতাম প্লেটে ছয়টি কালো বোতাম। কালো রঙের এই কোট পরতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কালো এই কোটের নাম মুজিব কোট। জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিব কোট নিয়ে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যেমন নেতৃত্বে ছিলেন কালজয়ী বলিষ্ঠ, তেমনি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন ততটাই সাদামাটা। আটপৌরে বাঙালি জীবনকে চিন্তা-চেতনায় ধারণ করে বেড়াতেন। পোশাক-পরিচ্ছেদ ছিল পরিপাটি কিন্তু সাদামাটা। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর এই সাদামাটা পোশাকেরও একটা নিজস্ব ট্রেন্ড ছিল। তিনি শার্ট, প্যান্ট, পাজামা, পাঞ্জাবি, শেরওয়ানি, কোট,টাই থেকে শুরু করে মুজিব কোট_ সবকিছুই পরতেন। কিন্তু এসব পোশাকের মধ্যেও তার নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত পোশাকের তালিকায় আছে পাজামা, পাঞ্জাবি, মুজিব কোট, হাফ হাতা শার্ট, ফুলহাতা শার্ট, প্যান্ট, নাইট গাউন, শাল, লুঙ্গি ও গেঞ্জি। অনুষঙ্গ হিসেবে আছে জুতা, স্যান্ডেল, চশমা ও পাইপ। এর সবকিছুরই রেপ্লিকা তৈরি করেছেন ডিজাইনার বদরুন নাহার রক্সি।
বঙ্গবন্ধুর ব্যবহার করা এসব অনুষঙ্গের রেপ্লিকা নিয়ে তিনি স্বর্ণালি যুগ শিরোনামে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছেন এ বছর। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে একটা হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমি ১০০ ধরনের মুজিব কোট তৈরি করেছি, যা আমার প্রদর্শনীর বিশেষত্ব।
বঙ্গবন্ধু প্রথমে যে মুজিব কোটটি পরেছিলেন, সেটি ছিল খাদি কাপড়ের তৈরি। আর সেলাই করে দিয়েছিল ১৬, বঙ্গবন্ধু এভিনিউর নিউ লাহোর টেইলার্স। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই টেইলার্সটি বন্ধ হয়ে যায়। যিনি সেলাই করতেন তিনিও আর বেঁচে নেই। তার ছেলের কাছে শুনেছি এই টেইলার্সেই বঙ্গবন্ধু অধিকাংশ কাপড় সেলাই করতেন। এছাড়া আরেকটি টেইলার্সে থেকেও পাজামা, পাঞ্জাবি বাসাতেন। যার নাম ছিল বশির টেইলার্স এন্ড ফেব্রিকস। যেটি এখনো নিউ মার্কেটে আছে পরিচালনা করছেন তার দুই নাতি।
বঙ্গবন্ধুর মুজিব কোটের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল।
কোটে ছয়টি বোতাম ব্যবহার হতো। এই ছয়টি বোতাম ব্যবহার করার কারণ হলো ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের প্রতীক। ভাবতে অবাক লাগে, একজন নেতা কতটা দেশপ্রেমিক হলে পোশাকের মধ্যেও দেশপ্রেম ধারণ করতেন।
তার পরিধেয় কোট এ সময়ে এসেও ফ্যাশনপ্রিয় মানুষের কাছে স্টাইল সিগমেন্ট হিসেবে ধরা দিয়েছে। ফরমাল পোশাকের সঙ্গে এ সময়ও সমান জনপ্রিয় মুজিব কোট। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে হালের জনপ্রিয় মডেল অনেকেই মুজিব কোট পরছেন। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে মুজিব কোট পরতে দেখা যায়। প্রদর্শনী উপলক্ষে ডিজাইনার রক্সি একশ ডিজাইনের মুজিব কোট তৈরি করেছেন। কোটের নকশা আর অলংকরণেও করেছেন নানা নিরীক্ষা। আর এসব মুজিব কোট তৈরি করতে তিনি তিন ধরনের থিম বেছে নিয়েছেন।
প্রথম থিম তিনি করেছেন রেপ্লিকা, যার পুরোটা বঙ্গবন্ধু যেসব মুজিব কোট পরতেন তার হুবহু মাপ ও কাটিং, প্যাটার্ন অনুসরণ করেছেন। এমনকি ইংল্যান্ডের সেভিল রয় টেইলার্স থেকে বঙ্গবন্ধু যে মুজিব কোট তৈরি করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেও ডিজাইনার রক্সি দুটি মুজিব কোট তৈরি করে এনেছেন প্রদর্শনীর জন্য। এসব মুজিব কোট প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের গায়ে জড়ানো থাকবে। রক্সির তৈরি করা মুজিব কোটের ফেব্রিকসও একই ধরনের রেখেছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু যেসব মুজিব কোট পরতেন, তাতে ছয় দফা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ছয়টি কালো বোতাম লাগানো থাকত।
রক্সির নকশা করা মুজিব কোটের বোতামও ছয়টি। বঙ্গবন্ধুর মুজিব কোটের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল কলারের ভেতর আলাদা কাপড়ের ডাবল কলার থাকতো। যেটা বোতাম দিয়ে আটকানো থাকত। এই আলাদা কাপড় ব্যবহারকে মনে করা হয় পরিধেয় শার্ট বা কোটের কলারটাই বেশি নোংরা হওয়ার কারণ। যাতে ব্যবহার করার সময় বেশি নোংরা না হয় সেজন্য। রেপ্লিকা থিমের মুজিব কোটগুলো সেভাবেই করেছেন।
মুজিব কোটের দ্বিতীয় থিম হলো দেশীয় ফেব্রিকস। এসব ফেব্রিকস হলো সুতি, সিল্ক, খাদি, জামদানি, পাট, উপজাতিদের তাঁতে তৈরি কাপড়, ডেনিম, নিট, চামড়া রিসাইকেল ফেব্রিকস ও ওয়েস্ট ফেব্রিকস।
তৃতীয় থিম হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের ভাবনা। এ সময়ের তরুণরা মুজিব কোট নিয়ে কী ভাবছেন, কেমন ধরনের কোট পছন্দ করছেন, সেই ভাবনাটাকে উপজীব্য করে তিনি মুজিব কোট তৈরি করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্যাটার্নে অবশ্য অনেক ধরনের বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন। তবে মূল ডিজাইনকে অক্ষত রেখেই করেছেন। তরুণদের জন্য মুজিব কোটের ডিজাইন করার সময় তিনি ভেবেছেন এখনকার তরুণরা কোন ধরনের ফেব্রিকস কিংবা পোশাক পরছে। অনেক তরুণ আছে যারা পাঞ্জাবি অতটা পছন্দ করেছে না। তাহলে তারা কীভাবে এই কোট পরবে? তারা চাইলে লম্বা শার্টের ওপর এ ধরনের মুজিব কোট পরতে পারবে_ সেটাও ভাবনায় রেখেছেন।
অলংকরণের বিষয়েও ডিজাইনার রক্সির আলাদা ভাবনা কাজ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন , বঙ্গবন্ধু তো কালো রঙের মুজিব কোট পরতেন। শুরুর দিকে খাদি কাপড়ে দু-একটা কোট তৈরি করে পরলেও পরে স্যুটের কাপড় দিয়েই তার কোট তৈরি হতো।
এ ক্ষেত্রে তিনি দেশীয় সব ধরনের ফেব্রিকসে যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি নকশার ক্ষেত্রে নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। বিশেষ করে পোশাকের অলংকরণের ক্ষেত্রে হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, এমব্রয়ডারি, বুনন নকশা, প্রাকৃতিক রঙের ডাই, প্রিন্টিং, লেজার প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট ও হ্যান্ড প্রিন্ট। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেসব ডাকটিকিট ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়, সেসব টিকিট স্ক্রিন প্রিন্টের মাধ্যমে মুজিব কোটের নকশায় তুলে ধরেছেন।
নৌকা মোটিফ হিসেবে বুনন নকশায় ব্যবহার করে তা দিয়ে তিনি কোট তৈরি করেছেন।
এ ছাড়া নিজের পরিচালিত পথশিশুদের
স্কু স্বপ্নের পাঠশালার বাচ্চাদের আঁকা দেশের থিম নিয়ে নানা ছবিও মুজিব কোটের অলংকরণে তুলে ধরেছেন। রঙের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ কোট সাদা-কালো, অফ হোয়াইট, অ্যাশ ও বাদামি_ এ ধরনের রংগুলোকে প্রাধান্য পেয়েছে। কোটের বোতামে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, দেশের মানচিত্র, বর্ণমালা, স্লোগান, পোস্টারসহ নানা মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ বোতামের মাধ্যম মেটাল , প্লাস্টিক ও প্রিন্টেড।
ঢাকার পর তিনি বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই প্রদর্শনী করবেন। এ ছাড়া দেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী করতে চান।
ডিজাইনার রক্সি বলেন, প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে সেমিনার করব। প্রদর্শনীর শুরুতে বঙ্গবন্ধুর পোশাক ও মুজিব কোট নিয়ে ফ্যাশন শো থাকবে। এ ছাড়া তরুণ ডিজাইনারদের জন্য একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করব। সারা দেশের ডিজাইনারদের কাছ থেকে ডিজাইন আহ্বান করব। সেখান থেকে বাছাই করা ডিজাইনারদের পুরস্কার দেব। এ ছাড়া একটা বইও প্রকাশ করছি এবং একটি অ্যাপস তৈরি করেছি। বঙ্গবন্ধুর জীবনযাপন ও পোশাক নিয়ে কাজ করার সময় আমি দেখেছি তিনি জীবনযাপনে যতটা সাধারণ ছিলেন, পোশাক-পরিচ্ছদে ছিলেন ততটাই অসাধারণ। আমার ইচ্ছা, বঙ্গবন্ধুর জীবনযাপন ও পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা হোক। বঙ্গবন্ধু কত অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে চাই।