রূপনগর ঝিলপাড় বস্তির আগুনে ভস্ম হাজার ঘর

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার ঝিলপাড় বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে।। আগুনে নিঃস্ব হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। গতকাল বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে আগুনের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসের ২৭টি ইউনিটের চেষ্টায় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আগুন নেভে। আগুনে বস্তির দুই হাজারের বেশি ঘরের মধ্যে অন্তত এক হাজার ঘর পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন রূপনগর থানার ওসি (তদন্ত) দীপক কুমার দাস। আগুনের মাত্রা বেড়ে গেলে বস্তির পাশের একটি ছয়তলা ভবনেও তা ছড়িয়ে পড়ে। তবে অগ্নিকা-ে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এ বস্তিতে মূলত রিকশাচালক, দিনমজুর, পোশাক কারখানার কর্মীদের মতো নিম্ন আয়ের লোকেরা থাকেন। আগুন লাগার সময় তাদের অনেকেই কর্মস্থলে ছিলেন। গাড়ি আসতে বিলম্ব হওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষুব্ধ বস্তিবাসী ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে হামলা চালায়। বস্তির বাসিন্দাদের অনেকেই পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন।

ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা জানান, সংকীর্ণ গলি দিয়ে তাদের গাড়ি নিয়ে পৌঁছতে বেগ পেতে হয়। কাছাকাছি পানির উৎস না পাওয়ার কারণেও কাজে বিঘœ ঘটে। পানি সংকট ও তীব্র বাতাসের কারণে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। আগুনের কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা জীবন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রূপনগরের রজনীগন্ধা অ্যাপার্টমেন্টের পেছনে ‘ট’ ব্লক বস্তিতে বুধবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে আগুনের সূত্রপাত। আগুন লাগার পর তা নিয়ন্ত্রণে তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এবং হেডকোয়ার্টার থেকে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ২৭টি ইউনিট। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুপুর সাড়ে ১২টারি দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে আগুন নির্বাপণ হয়। আগুনে হতাহতের কোনো তথ্য নেই, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তাৎক্ষণিক জানা যায়নি।’

বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়। কারণ বস্তির এ জায়গা খালি করার জন্য তাদের ওপর চাপ ছিল। আগুন লাগার পর বস্তির পাশেই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ফ্ল্যাট প্রকল্পের নামে টানানো একটি সাইনবোর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে লেখা আছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের নিজস্ব সম্পত্তিতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের পুনর্বাসনের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান। বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের নিজস্ব সম্পত্তি। এখানে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গৃহায়নের পক্ষ থেকে সংস্থাটির সদস্য (প্রকৌশল) এসএম ফজলুল কবীরকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসে অগ্নিকাণ্ডের কারণসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

ঝিলপাড় বস্তির পাশে মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের চলন্তিকা বস্তিতে গত বছর আগস্টে এবং চলতি বছর জানুয়ারিতে দুই দফা অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এবার এ বস্তিতে আগুন লাগার কারণ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনেও। আগুন লাগার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, রূপনগর আবাসিক এলাকার ট-ব্লকের মাঝামাঝি অবস্থিত ঝিলপাড় বস্তিটি। বস্তির শেয়ালবাড়ী ও আরামবাগ দুটি অংশ। আরামবাগ অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়। এর আগে গত বছর চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লেগে কয়েক হাজার ঘর পুড়ে যায়। চলন্তিকা বস্তির পোড়া অংশের যেখানে শেষ সেখান থেকেই এবার আগুনের সূত্রপাত হয়। সেখানে হাজারখানেক খুপরি ঘর ছিল। বেশিরভাগ ঘরই ছিল তালাবদ্ধ। ঘরগুলো তখনো দাউ দাউ করে জ¦লছিল। অনেকেই ঘরের মালামাল রক্ষার চেষ্টা করেন। তবে আগুনের তীব্রতার ফলে বেশিরভাগই ব্যর্থ হন। নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয়রাও আগুন নেভাতে চেষ্টা করেন। আগুনের মাত্রা বেড়ে গেলে বস্তির পাশের একটি ছয়তলা ভবনেও তা ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে দেরির অভিযোগ তুলে তাদের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ বস্তিবাসী। এই এলাকার সাবেক কাউন্সিলর হাজি রজ্জব হোসেন জানান, রজনীগন্ধা মার্কেট থেকে ওই বস্তির দূরত্ব সিকি কিলোমিটারের মতো। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সেখান দিয়েই ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের ভিড়ের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি ঢুকতে দেরি হয়। তাতে কাজেও বিঘœ ঘটে। আরামবাগ পয়েন্ট দিয়ে ঢুকলে ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের কাজে সুবিধা হতো।

ক্ষতিগ্রস্তদের একজন মো. আয়নাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে বস্তির নাসিমার ঘরের গলিতে দুটি ঘরে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে থাকি। আগুন লাগার সময় আমি রিকশা চালাচ্ছিলাম। আমার স্ত্রী গার্মেন্টসে ছিল। খবর পেয়ে ছুটে আসি। কিন্তু কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। আমার প্রায় ৪০ হাজার টাকার মালামাল পুড়ে গেছে।’

আরেক বাসিন্দা নাসির জানান, সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়ায় একটি রুমে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। তিনি একটি দোকানে কাজ করেন আর তার স্ত্রী পোশাকশ্রমিক। দুজনই সকালে কাজে যান। সকাল ১০টার দিকে তার স্ত্রী ফোনে বস্তিতে আগুন লাগার খবর দেয়। ঘটনাস্থলে এসে তিনি দেখেন, বস্তির উত্তর দিকে আগুন জ¦লছে। তাড়াহুড়া করে ঘরে থাকা ফ্রিজ ও ড্রেসিংটেবিল বের করতেই আগুন তাদের ঘরের কাছে চলে আসে। এরপর আর কিছু আনতে পারেননি। তিনি আরও জানান, বাতাসের গতি বেশি থাকার কারণেই আগুন দ্রুত ছড়ায়। তারা ল্যাংড়া মানিকের ঘরে ভাড়া থাকতেন। মানিকের আরও আটটি রুম ভাড়া দেওয়া ছিল। ওই ভাড়াঘরের বাসিন্দাদের জন্য রান্নার চারটি চুলা ছিল। চুলাগুলোতে ছিল অবৈধ গ্যাসলাইন (প্লাস্টিকের পাইপে)। চুলাপ্রতি ৪০০ এবং বিদ্যুৎ বিল ৩০০ টাকা দিতে হতো। বিলবাবদ এ টাকা স্থানীয় নেতাদের দিতে হয় বলে মানিক ভাড়াটিয়াদের জানাতেন। প্লাস্টিকের গ্যাসের পাইপের কারণেই আগুনের তীব্রতা বাড়ে বলে নাসিরের ধারণা।

আগুন লাগার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত শেল্টার সেন্টারে রাখা হবে। আশপাশের স্কুলগুলোতে থাকার ব্যবস্থা করা হবে। খাবার দেওয়া হবে। দুপুর ও রাতের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। দুইটা লাগে, চারটা লাগে, পাঁচটা লাগে আমরা তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করব। একজনও খোলা আকাশের নিচে থাকবে না। যে পর্যন্ত এখানে তাদের বসবাস উপযোগী না হবে সে পর্যন্ত আমরা তাদের পাশে আছি।’ অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে এখানকার বস্তিতে বারবার আগুন লাগেÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি এ কারণে আগুন লেগে থাকে, ইতিপূর্বে বলল না কেন আমাকে? যারা গ্যাসের দায়িত্বে আছে, তাদের বলল না কেন? যারা এসব অপযুক্তির কথা বলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি সত্যি গ্যাসের লাইনের এমন কিছু (অবৈধ সংযোগ) করে থাকে, তাহলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ডিজি, পুলিশ আছে এখানে, তাদের বলব, তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।’

আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আগুনের খবর পাওয়ার পর বস্তিবাসী বিভিন্ন আসবাব দিয়ে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে রাখে। যে কারণে আমাদের গাড়ি ঢুকতে বাধা পায়। প্রচুর পানি সংকটও ছিল। তাছাড়া ফাঁকা জায়গায় তীব্র বাতাস থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সব মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের বেগ পেতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক জলাধার না থাকায় বরাবরের মতো পানি সংকটে পড়তে হয়। আশপাশের বিভিন্ন ভবনের রিজার্ভ ট্যাংকি থেকে পানি নিয়ে আমরা কাজ করেছি। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় পুরোপুরি আগুন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ডাম্পিংয়ের কাজ অব্যাহত আছে।’

এখনো হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগুন পুরোপুরি নির্বাপণের পর এলাকা সার্চ করে দেখব আহত-নিহত আছে কি না।’ আগুনে লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা বলেন, বস্তিবাসী ফায়ারের গাড়ি ঢুকতে বাধা দেয়। তারা ফায়ারকর্মী ও গাড়িতে আক্রমণ করে। এটা ঘরহারা বস্তিবাসী আবেগ থেকে করেছে বলে মনে করি। ধৈর্যের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশের সহায়তায় বস্তিবাসীদের বুঝিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করা হয়। আরেক প্রশ্নের জবাবে লে. ক. জিল্লুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তা নিশ্চিত হতে তদন্ত রিপোর্টের দরকার রয়েছে। এছাড়া পুরো বস্তিতে প্লাস্টিকের পাইপে গ্যাসলাইনের সংযোগ ছিল বলে দেখেছি আমরা। সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।’