গত কয়েক বছর ধরে জমিতে ধান চাষ করে লোকসানের মুখ দেখছেন হাওরাঞ্চলের কৃষক। এ বছর বোরো ধানের জমি বিনামূল্যে দিতে চাইলেও সেটা নেয়নি কেউই। হাজার হাজার হেক্টর পতিত বোরো জমিতে এখন চড়ে বেড়াচ্ছেন গরু ছাগল। যেন এসব জমিতে চর জেগে উঠেছে। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নিকলী উপজেলার পূর্ব গ্রামের সবচেয়ে বড় জমিদার ছলিমুল হক সেলিম।
শুধু সেলিমই নয়, তার মতো হাওরের আরও অনেক জমিদারের হাজার হাজার হেক্টর জমিই এখন অনাবাদি অবস্থায় পতিত পড়ে আছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিগত তিন থেকে চার বছর ধরে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং বোরো চাষে অব্যাহত লোকসানকেই দায়ী করছেন সেখানকার কৃষকরা। ফলে দিন দিন বোরো আবাদ ছেড়ে দিচ্ছেন হাজারো কৃষক।
কিশোরগঞ্জ জেলাকে বোরো ধানের জেলা বলা হতো। সারা দেশের বোরো উৎপাদনের সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনের উৎস ছিল হাওরাঞ্চল। কারণ জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৮টি উপজেলায় বড় বড় হাওর রয়েছে। যেখানে হাজার হাজার হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। এসব এলাকার প্রধান ফসল হলো বোরো ধান। কয়েক বছর আগেও হাওরের মাঠজুড়ে ধানের চাষ হলেও এ বছরে যত দূর চোখ যায় অনাবাদি (পতিত) জমি দেখা মেলে। গত বছর বাম্পার ফলনের পরও ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়েছেন কৃষকেরা। আর এ লোকসানের কারণে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত পড়ে আছে। কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরে কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। যদিও সরকারি হিসাবের সঙ্গে একমত নন স্থানীয় কৃষকেরা। তারা বলছেন, হাওরে অন্তত ২৮ থেকে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে এবার বোরো চাষ করা হয়নি। যা সম্পূর্ণ অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে।
ইটনা উপজেলার পূর্ব গ্রামের জমিদার ও স্কুলশিক্ষক ইউসুফ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাওরে আমার একশ একর জমি রয়েছে। এ বছর এক একর জমিও কোনো বর্গাচাষি পত্তন নেয়নি। আমার সম্পূর্ণ জমি পতিত রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান, কৃষকেরা এক একর জমিতে ধান চাষ করতে যে খরচ হয় ফসল বিক্রি করে তা ওঠে না। উল্টো তাদের লোকসান গুনতে হয়। সরকার যদি ধানের ন্যায্যমূল্য না দেয়, তাহলে আগামী বছর হাওরের সব জমিই পতিত থাকবে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সাইফুল আলম বলেন, এ অঞ্চলে প্রতিবছরই প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিকটন বোরো চাষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে আসছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কারণে এ এলাকার কৃষকেরা ধানের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। যথাযথভাবে যদি তারা সেটি পেতেন, তাহলে ধান চাষ থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিতেন না।