প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য ঋণ এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেওয়ার নামে জনপ্রশাসনে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল সরকারের গাড়ি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ¦ালানি ব্যয় কমানো। অর্থাৎ যত বেশি কর্মকর্তাকে এ সুবিধা দেওয়া হবে সরকারের এ খাতে তত ব্যয় কমবে। কিন্তু সরকারের ব্যয় তো কমেইনি, বরং বেড়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরে সুদমুক্ত অগ্রিম ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৩২৩ জন। পেট্রল ও লুব্রিকেন্ট অয়েল বাবদ খরচ ছিল ১ হাজার ৬৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৩ হাজার ৬০৮ জন হলেও পেট্রল ও লুব্রিকেন্ট অয়েল খাতে খরচের পরিমাণ ১ হাজার ৪১৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এ সময় পেট্রল ও লুব্রিকেন্টের দাম না বাড়লেও এ খাতে সরকারের খরচ বেড়েছে।
সরকারের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। গত বৃহস্পতিবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের কার্যবিবরণী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়। জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বিভিন্ন ক্যাডার কর্মকর্তারা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ করেন। বৈঠকে জানানো হয়, প্রশাসন ক্যাডারের মতো সব ক্যাডারের উপসচিব পর্যায়ের বা পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সবাইকে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দিতে হলে মোট ৪৯ হাজার ৬৫০ জনকে এ ঋণ দিতে হবে। তাদের জন্য সরকারের ব্যয় হবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। বৈঠকে ৫০০ গাড়ি চালকের একটি পুল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এ পর্যন্ত সুদমুক্ত অগ্রিম ঋণ গ্রহীতার সংখ্যা ৩ হাজার ৭৯১ জন। তাদের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
২০১১ সালের ১৫ মার্চ প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়িসেবা নগদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। নীতিমালা অনুসারে সরকারের যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ প্রদানের কাজ শুরু হয়। পরে নীতিমালাটিতে নানা পরিবর্তন ও সংযোজন আনা হয়। ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে সরকারের উপসচিবদের সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার দিয়ে নীতিমালায় সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ অবস্থায় সরকারের উপ-সচিবের সঙ্গে বেতন গ্রেডের ভিত্তিতে সমপদমর্যাদার দাবিদার বিভিন্ন ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণের দাবি উত্থাপন করেছেন। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সভাপতি জনপ্রশাসন সচিব জানান, কোনো কর্মকর্তা একাধিক গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের সমাপ্তিতে প্রকল্পের গাড়ি সরকারি পরিবহনপুলে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা জমা না দিয়ে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ নিয়ে দেড় কোটি টাকা দামের গাড়ি ক্রয় করছেন, যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে গাড়ি কেনার জন্য আয়কর নথিতে সংশ্লিষ্ট অর্থ প্রদর্শিত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হয়ে অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তাদের দাবি মেটাতে হলে যে টাকা দরকার তা সরকারের বাজেটে সংকুলান হবে কি না তাও ভেবে দেখা সব কর্মকর্তার দায়িত্ব। এছাড়া এত গাড়ি কেনা হলে ঢাকা শহরের যানজটের ভয়াবহতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দুলাল কৃষ্ণ সাহা সুদমুক্ত অগ্রিম ঋণ গ্রহীতা প্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েক কর্মকর্তার সরকারি গাড়ির ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরেন।
সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার মিজানুর রহমান আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে জানান, প্রকল্প সমাপ্তির ৬০ দিনের মধ্যে গাড়ি সরকারি পরিবহনপুলে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও গাড়িগুলো জমা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণের অর্থে কেনা গাড়ির আলাদা রংয়ের নাম্বার প্লেট দেওয়া যায় কি না তা প্রস্তাব করেন।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব এসএম মাহবুবুর রহমান জানান, সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণের অর্থে কেনা গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই পর্যায়ে তাকে বৈঠক থেকেই জানানো হয় বেসরকারি গাড়ি চালকদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা নেই। এরা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত কি না তা না জেনে সচিবালয়ে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হবে না। বেসরকারি ড্রাইভার চালিত সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিমের অর্থে কেনা গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশের বিষয়টি সচিবালয়ের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক জহির রায়হান বৈঠকে বলেন, কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ঋণ প্রদানসহ মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দেওয়ার পরও সরকারের জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ সম্পর্কে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর কথা বলেন তিনি। এ বিষয়ে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির ওপর মতামত দেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ফজলে লোহানী বলেন, সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা হলেও পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। তিনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অন্যান্য ক্যাডার থেকে যাওয়া উপ-সচিবরা মন্ত্রণালয়ের রুটের মাইক্রোবাস ব্যবহার করছেন। এছাড়া তারা মিশনে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পুরো অর্থ গ্রহণ করছেন।
বৈঠকে সভাপতি জানান, আগে থেকেই যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত অগ্রিম ঋণ দেওয়া হলেও সমমর্যাদার কর্মকর্তাগণকে এ সুবিধা দেওয়া হয়নি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সংগতির বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।
লেজিসলেটিভ বিভাগের যুগ্ম সচিব ফরহাদ হোসেন বলেন, সরকারি সুবিধা একবার প্রদান করে তা প্রত্যাহার করলে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুদূরপ্রসারী ফল বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের সুবিধা প্রদান করা উচিত ছিল।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা প্রাধিকারের গাড়ির পাশাপাশি ডিপার্টমেন্টের গাড়ি ব্যবহার করছেন তারা গুরুতর অনিয়ম করছেন। প্রাধিকারের গাড়ি নিয়ে তা ব্যবহার না করে অফিসের গাড়ি ব্যবহার দুর্নীতি। সুদমুক্ত গাড়ি নিয়ে নানা অনিয়মের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। এসব বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।