বিশ্বে মহামারী রূপে রোগের আবির্ভাব নতুন কিছু নয়, তাতে শোকাবহ মৃত্যু কোনো তত্ত্বের অধীন নয়। জীবাণু, অণুজীব তথা ভাইরাস ও ছত্রাক তাদের স্বভাব-মাফিক অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিস্তার লাভ করে; প্রাণিজগৎ; জীবজগতের ওপর হামলা চালায়, এমনকি উদ্ভিদজগতেও। পরিণামে ব্যাপক হারে মৃত্যু মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের।
একদা ইউরোপে প্লেগ মহামারীতে ব্যাপক প্রাণহানির কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এরপর স্থানিক মহামারী একাধিক জীবাণু বা ভাইরাস রোগের আক্রমণে, ব্যাপক প্রাণহানি এবং তা ভূখণ্ড বিশেষে নিয়মিত চরিত্রে (এন্ডেমিক)। এর সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের, ব্যক্তি-স্বভাব ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পানি বা খাদ্যবাহিত যেসব রোগের ব্যাপক আক্রমণ সহজে রোধ করা যায় (প্রতিরোধ ব্যবস্থায়), সেগুলোতেও একদা বঙ্গদেশে ব্যাপক হারে মৃত্যু ঘটতে দেখা গেছে, যেমন– কলেরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অমূল্য বাণী– ‘চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ আমরা বরাবর উপেক্ষা করে এসেছি। যেমন ব্যক্তি, সমাজ তেমনি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কর্তৃপক্ষ। তা না হলে যেমন মারাত্মক পানিবাহিত রোগ (কলেরা, টাইফয়েড জ¦র, জন্ডিস ইত্যাদি) অতি সহজে প্রতিরোধ করা যায়, যেমন পানীয়জল যথারীতি ফুটিয়ে পান করলে, এই সাদামাটা সচেতনতার অভাবে কত সাধারণ মানুষের যে মৃত্যু ঘটেছে, তা-ই নয়, কিছুসংখ্যক অমূল্য প্রাণেরও মৃত্যু গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তেমন দু-চারটে ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে।
বিশেষ ব্যবস্থার কারণে কলেরা বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্তপ্রায় এবং মারাত্মক গুটিবসন্ত রোগ পুরোপুরি নির্মূল, ম্যালেরিয়া অনেকাংশে। তেমনি ভ্যাকসিনের কল্যাণে পোলিও-ডিপথেরিয়া ইত্যাদি রোগ। কিন্তু জলবাহিত বা মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সবচেয়ে জরুরি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও সঠিক কর্মতৎপরতা।
দুই. কিন্তু জাতি হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে, সমষ্টিগত কর্মের ক্ষেত্রে একটি আপ্তবাক্য আমাদের জন্য খুবই সঠিক– ‘স্বভাব না যায় মলে’। এ কারণে আমাদের অর্জনের ইতিহাস/ঐতিহ্য মিথ্যে হয়ে যায়, যা সবচেয়ে বেশি দৃষ্ট স্বাস্থ্য খাতে– যেখানে রয়েছে জীবন-মৃত্যুর খেলা। বহু উদ্ধৃত কথাটা আবার বলি, বিশেষ করে গত বছরের (২০১৯) ডেঙ্গু রোগের প্রায়-মহামারীতুল্য অবস্থা দৃষ্টে। ম্যালেরিয়া থেকে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার (নতুন ভাইরাস রোগ) মতো মারাত্মক রোগও সহজে প্রতিরোধ করা যায় নিছক মশক নিধনের মাধ্যমে– হোক তা অ্যানোফিলিস বা এডিস-জাতীয় মশা।
কাজটা খুব সহজ। দরকার সদিচ্ছা ও সততার। ওই যে উদাহরণের কথা বলেছিলাম, তা হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার উষালগ্নে ঢাকা শহরকে মশক কুখ্যাতি থেকে মুক্ত করেছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবীবুল্লাহ বাহার। আর সে সাফল্যে খ্যাতিও পেয়েছিলেন। অথচ সে সময়ের তুলনায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি সত্ত্বেও ঢাকা শহরকে মশকমুক্ত করা যায়নি। এর দায় যেমন স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের এবং তাদের উচ্চ থেকে নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের, তেমনি ব্যক্তি-পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব। মশার উৎপত্তিস্থলের বিনাশ সম্পর্কে উদাসীনতা যেন আমাদের স্বভাবের অঙ্গ। গত বছরের ডেঙ্গু আক্রমণের ব্যাপকতা এর আগের দুই বছরের ডেঙ্গু ও মূলত নতুন ভাইরাস রোগ (ডেঙ্গুসদৃশ) চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক আক্রমণ এবং বেশ কিছুসংখ্যক মৃত্যু ওপরে উল্লিখিত অভিযোগগুলো প্রমাণ করে। এ বছরও লক্ষ করছি, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে সতর্কতার অভাব। বিষয়টি বারান্তরে আলোচ্য।
তিন. ভাইরাস রোগ নিয়ে বড় সমস্যা ভাইরাসবিরোধী ওষুধের অভাব। এ প্রসঙ্গে আবারও দু-চার লাইনের আনুষঙ্গিক কথা বলতে হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণার ক্ষেত্রে; দুঃখজনকই নয়, দুর্ভাগ্যজনকও বটে যে অ্যাস্ট্রোফিজিকস, নভোবিজ্ঞানের মতো বিষয়াদির গবেষণা ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা অনেক পিছিয়ে। যে কারণে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির প্রেক্ষাপটে ভাইরাস ও ক্যানসার গবেষণার অগ্রগতি অনেক কম। অথচ এ দুই ঘাতক খাতে মানব-মৃত্যুর সংখ্যা অনেক, কখনো তা মহামারীর আকারে। ভেষজবিজ্ঞানেও একই দুরবস্থা। তাই যেমন ভাইরাসবিরোধী ওষুধের অভাব, তেমনি অবস্থা ক্যানসারের ক্ষেত্রে। তাই দুটি ক্ষেত্রেই জীবনের নিরাপত্তা হলো স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা ও সতর্কতা– এবং তা ব্যক্তি থেকে সমষ্টি ক্ষেত্রে, সর্বাধিক শাসনব্যবস্থা তথা স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্গত। গত বছর ডেঙ্গু আক্রমণের ব্যাপকতায় এই দুদিকেই যথেষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে।
এর তাৎপর্য হলো আমরা যেকোনো ধরনের রোগের ব্যাপকতা তথা মহামারী বা আধা-মহামারীর মোকাবিলায় যথেষ্ট পারঙ্গম নই, আগাম সংকেতবার্তা থাকলেও বিদেশি কোনো কোনো রাষ্ট্রের মতো দক্ষতা ও তৎপরতা প্রকাশে ততটা সক্ষম নই। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক অভ্যাসের এমন এক দুর্বলতার পরিপ্রেক্ষিতে বজ্রপাতের মতো করোনাভাইরাসের আবির্ভাব ঘোষণা– চীন থেকে ইতালি হয়ে, কবির ভাষায় ‘বিশ^ময় গিয়েছে তা ছড়িয়ে’।
ভাইরাস তো প্রধানত বায়ুবাহিত, সর্বনাশের বড় দিকটা এ মুখী। এরপর থেকে বিশ^জুড়ে আতঙ্ক– ব্যক্তিপর্যায় থেকে রাষ্ট্রপর্যায়ে সংবাদপত্রে করোনাভাইরাস বিনে অন্য কোনো গীত নেই, যা আছে তা গৌণ পর্যায়ের। যেমন– সংবাদ প্রতিবেদনে, তেমনি উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধে এবং টিভির কথকতায়। শুধু এগুলো উদ্ধৃত করেই একটি লেখা শেষ করে ফেলা যায়। সে পথ না মাড়ানোই ভালো। তবু বক্তব্যের তাৎপর্য বিচারে কিছু শিরোনাম উল্লেখ পরিহার করা যায় না। যেমন– এ লেখার সময় দেখছি একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘করোনা ছড়াল ১২১ দেশ ও অঞ্চলে’। ‘সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্ত দেশ ও অঞ্চলের সংখ্যা’। বিশ^যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো প্রতিদিনের ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে আর সে অনুযায়ী মানুষের প্রতিক্রিয়া, এ ক্ষেত্রে ভয় ও আতঙ্কের।
কারণ দুর্দান্ত ঘাতক করোনাভাইরাসের আক্রমণ মানেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষা। তাই বাংলাদেশে ক্রমাগত আতঙ্কবিরোধী ঘোষণা উচ্চারিত হচ্ছে সব মহল থেকে– সরকারি কিংবা বেসরকারি। উপদেশ ও পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি সম্পাদকীয় লেখা হচ্ছে এমন শিরোনামে, ‘করোনাভাইরাস মোকাবিলা/প্রস্তুতিতে ঘাটতি কাম্য নয়’। আমরাও একই কথা বলি; দেশের প্রবেশপথগুলোতে সঠিক প্রযুক্তিগত পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা (‘চেকিং’) নিশ্চিত করুন। এখানে কোনোপ্রকার উদাসীনতা বা অবহেলা কাম্য নয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে এরই মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ ‘কোয়ারেনটাইন’ বা ‘সঙ্গনিরোধ’ অবস্থায় আছে, দরকার সেসব জায়গায় সুব্যবস্থাপনা। কারণ অবরুদ্ধ ইতালি থেকে বাংলাদেশে নাগরিকের আগমন বন্ধ হয়নি। যেমন হয়নি চীনসহ আক্রান্ত একাধিক দেশ থেকে। চীন প্রথম ও সর্বাধিক আক্রান্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত ও লৌহকঠিন সুদৃঢ় ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য অর্জন করেছে।
তাই এমন কথাও শোনা যাচ্ছে (রাজনৈতিক স্লোগান নয়) : চীনের পথ আমাদের পথ। একটি শিরোনাম : ‘চীনের সাফল্যের নেপথ্যে দ্রুত সর্বাত্মক উদ্যোগ’। স্বদেশ সম্পর্কে পাশাপাশি ‘লিড নিউজ’– ‘সতর্কতার পাশাপাশি ঘাটতিও অনেক’। প্রতিবেদনটির সঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম : ‘করোনাকে বৈশি^ক মহামারী ঘোষণা’ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার। দীর্ঘ এসব প্রতিবেদন। আর তাই দেখে হুজুগে বাংলাদেশি চড়াদামে ‘মাস্ক’ কিনতে হামলে পড়েছে বাজারে। ভাবটা যেন মাস্ক পরলেই সব রক্ষা।
বাংলাদেশ আক্রান্ত সন্দেহ নেই, কিন্তু আতঙ্কের বদলে দরকার বিশেষজ্ঞদের উল্লিখিত প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো পালন– জনসমাগম ও আক্রান্ত এলাকা পরিহার, গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ, যারা আক্রান্ত তাদের সম্বন্ধে যথাযথ চিকিৎসা ও ব্যবস্থা গ্রহণ, তাদের পরিবারের জন্য দরকার স্বাস্থ্যসম্মত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে শিক্ষায়তনগুলোতে ছুটি ঘোষণার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, তেমনই সভা-অনুষ্ঠানাদি। দরকার যেমন সরকার পক্ষে, তেমনি সমাজে ও পরিবারে এবং ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাস্থ্যসম্মত নিরিখে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, আতঙ্ক নয়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস এখনো আতঙ্কের পর্যায় সৃষ্টি করেনি। ইতিমধ্যে আবহাওয়ায় উষ্ণতা বেড়ে গেছে, বেড়ে চলেছে। আশা করা যায়, করোনাভাইরাসের ঘাতক শক্তিও হ্রাস পেতে থাকবে। তাই বলে সরকারি উদ্যোগে যেন ঘাটতি না পড়ে।
লেখক
ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্রগবেষক