ফেইসবুকে, ব্লগে কিংবা অনলাইন পোর্টালগুলোয় প্রায়ই দেখবেন একটা ছবি ঘোরে। ছবিটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তান সফরের সময়ে তোলা। ছবিতে দেখা যায় বিমানবন্দরে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা বঙ্গবন্ধুকে প্রটোকল দিচ্ছেন। এদেরই একজন জেনারেল টিক্কা খান। একাত্তরের কসাই। তো ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার বাড়ানো হাতে হাত মেলাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। তো কী করা উচিত ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের? ওই হাত অবজ্ঞা করা? তাহলে যে কারণে তিনি পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন সেটার উদ্দেশ্যটাই বাতিল হয়ে যায়! সে ক্ষেত্রে তার পাকিস্তান সফরে যাওয়াই উচিত হয়নি। বাস্তবতা কি তাই বলে? কী পেয়েছিলাম আমরা সেই সফরে? তার আগে কিছু কথা বলা দরকার।
আজ আপনি আমজনতা হিসেবে কোনো দেশকে, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে শত্রু গণ্য করতেই পারেন। সেই আপনিই যখন এই দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন হবেন, আপনি চাইলেও সেই ঘৃণা জারি রাখতে পারবেন না। এই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ওই ঘৃণিত রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ করতেই হবে যদি সেই দেশের সঙ্গে আপনার দেশের কোনো দেনা-পাওনা থাকে। কোনো হিসাব মেটানোর থাকে। কোনো আলোচনা থাকে। এভাবে পাকিস্তান ভারতের প্রধানমন্ত্রীরাও বৈঠক করেন। আমেরিকা-রাশিয়াও করেছে। ক্যাম্প ডেভিডে ইসরায়েল-আরবরাও করেছে। সেখানে আপনি সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনায় এসেছেন সেই ভাব প্রকাশে আপনাকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে ছবি তুলতে হবে, করমর্দন করতে হবে। কিন্তু সেটা কখনো সার্বিক অবস্থার প্রতিফলন নয়। ভারত পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানের করমর্দনের হাস্যোজ্জ্বল ছবি কখনো বোঝায় না দুইদেশের মধ্যে বৈরিতা নেই। একইভাবে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর আর্কাইভাল ছবিগুলো দেখে এই সিদ্ধান্তে আসবেন না আরাফাত পালেস্টাইন আন্দোলন বা ফাতাহকে বিক্রি করে ইসরায়েলিদের পা চেটেছেন। বা আরবরা ইসরায়েলিদের সব পাপ ক্ষমা করে তাদের বুকে টেনে নিয়েছে। জেনারেল নিয়াজি চারঘণ্টা আগে ব্যাপক কান্নাকাটি করলেও ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে হাসিমুখেই সই দিয়েছেন আত্মসমর্পণে। দিস ইজ প্রটোকল। কথাগুলো বলা আসলে আমাদের একদল জ্ঞানপাপীর উদ্দেশ্যে। যারা ইচ্ছেকৃত ইতিহাসবিকৃতির মাধ্যমে, মনগড়া আরোপের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। বড় কোনো অর্জনকে মিথ্যার মাধ্যমে তুচ্ছ ও ঘৃণিত বানিয়ে ফেলে। ফেইসবুকে এদের অহরহ দেখা মেলে। এবং তারা এখনো মন থেকে তাদের পূর্বসূরিদের মতো এই দেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। সেখানে নানা মিথ্যাচারের মতো নানা নুইসেন্স লজিকের মতো তারা মুজিব-ভুট্টোর প্রসঙ্গ এনেছে, পাকিস্তানে ১৯৭৪ সালের সেই ঐতিহাসিক সফরকে নোংরা বানিয়েছে।
কোনো দেশ স্বাধীন বলে নিজেকে ঘোষণা করলেই স্বাধীন হয়ে যায় না। সেই স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রয়োজন। আর যেই দেশের মানুষের বেঁচে থাকাই পরের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল তার তো সেই মুখ থাকে না ভিক্ষার চাল কাড়া না আকাড়া যাচাই করার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই গরিব দেশের মানুষের নেতা, তারপরও মাথা উঁচু করে চলার চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ, বাতাসে লাশের গন্ধ, পানিতে লাশ। ফসলের জমি সব বোমার আঘাতে দীর্ণ, নদীর পানিতে লাশ, মাছেরা সেই লাশ খায় বলে জেলেরা মাছ ধরতে পারে না, কারণ সেই মাছ কেউ খাবে না। সাত কোটি ভুখা বাঙালি নিয়ে মুজিব তাও মাথা উঁচু করে কথা বলে গেছেন। তার এই ভাবটা দেখা গেছে প্রথম দিন থেকেই। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই। সেখানে তিনি বললেন, তোমরা ব্রিটিশরা জানো আমার দেশ সম্পর্কে, সেটা স্বর্ণগর্ভা। তোমরা দুশো বছর সেখান থেকে নিয়েছ, নিজেদের সমৃদ্ধ করেছ। এবার তোমাদের কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। আমার দেশের মানুষ না খেয়ে আছে।
মুজিব চাইলেই সেইসময় শীতল যুদ্ধের দুই পরাশক্তির একটাকে বেছে নিতে পারতেন। রাশিয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে। জাতিসংঘে ভেটোর পর ভেটো দিয়ে নিশ্চিত করেছে স্বাধীনতা। কিন্তু মুজিব অপেক্ষা করেছেন। অর্থ সাহায্য চেয়ে এমনকি নিক্সনের সঙ্গে যখন বৈঠক করছেন তখন তার মিনিটে (বৈঠকের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ) দেখা যায় তিনি বলছেন, আমার দেশের পাট আছে, আমার মাটির নিচে গ্যাস আছে। তোমরা সাহায্য দাও, আমি দেশটাকে দাঁড় করাই, কথা দিচ্ছি বছর দশেকের মধ্যে আমরা তোমাদের সব ঋণ সুদে আসলে ফিরিয়ে দেব। নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে এভাবে ভিক্ষা চাইতে পারে কয়জন!
সে সময় সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধপরাধীদের বিচার। যা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক চাপ ছিল নানামুখী। প্রথম কথা বাংলাদেশ তখনো আরব দেশগুলোর স্বীকৃতি পায়নি। স্বীকৃতির বিনিময়ে তারা বলেছে পাকিস্তানিদের ছেড়ে দিতে। বিশ্বব্যাংক এবং দাতা দেশগুলো এলো নতুন দাবি নিয়ে। তারা বলল বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভালো কথা, এখন পাকিস্তানকে আমরা যেসব খাতে ঋণ দিয়েছি সেগুলোও তাকে ভাগাভাগি করে নিতে হবে! পাকিস্তানের কাছে যেখানে আমরা সম্পদের ভাগ চেয়ে দাবি তুলতে যাচ্ছি, সেখানে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না নেওয়া ঋণের বোঝা। অবশ্য তার শর্ত শিথিলযোগ্য, যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাতিল করা হয়! বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ পাচ্ছিল না। কারণ চীন ভেটো দিচ্ছে। হ্যাঁ সদস্যপদ পাওয়া সম্ভব, কমিউনিস্ট চীনও বাগড়া দেবে না যদি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
সিমলায় জুলফিকার আলী ভুট্টো শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। দুই দেশের মধ্যে বৈরী ভাব দূর করতে এবং যুদ্ধবন্দি বিনিময় চুক্তি করতে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব। ভারতের কাছে যারা যুদ্ধবন্দি, বাংলাদেশের কাছে তারা যুদ্ধাপরাধী। বাংলাদেশকে ছাড়া এমন কোনো চুক্তিতে আসা সম্ভব না। মুজিবের দূরদর্শিতা এখানেই যে ভারত-পাকিস্তান ১৯৭১ সালকে নিজেদের যুদ্ধ বলে চালিয়ে দিতে পারেনি, আটক পাকিস্তানিদের স্রেফ যুদ্ধবন্দি হিসেবে বিনিময়যোগ্য করতে পারেনি। কারণ ওই যুদ্ধাপরাধের তকমা। অতএব বাংলাদেশকে আমলে নিতে হবেই। এবং যা আলোচনা হবে ত্রিপক্ষীয়। এদিকে ভুট্টোর কাউন্টার মেজার শুধু আরব দেশ, চীন এবং মার্কিন চাপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন যে তার দেশে আটকেপড়া বাঙালিদের একইরকমভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে বিচার করবেন যদি বাংলাদেশ পাকিস্তানি কোনো সেনাসদস্যকে বিচারের মুখোমুখি করে। সেজন্য দুহাজার বাঙালি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাকে জেলে পুরে তাদের বিচারের প্রাথমিক ব্যবস্থাও সারলেন। শেখ মুজিব বাংলাদেশকে নিয়ে গেলেন ন্যামে। নন-এলাইড মুভমেন্ট নামে এই জোটের জন্ম ১৯৬১ সালে বেলগ্রেডে। মার্কিন-সোভিয়েত বলয়ের প্রভাবমুক্ত থেকে ২৫টি উন্নয়নশীল দেশ এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সূচনা করেছিল এর। ১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ এর সদস্য হয়। আলজিয়ার্সের সেই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে কথা বলে মুগ্ধ ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলে ওঠেন : আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি! সেই সম্মেলনেই মিসর, আলজেরিয়া ও লিবিয়ার মাধ্যমে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে একটা মীমাংসায় যাওয়ার উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধু। এ কথা মনে রাখতে হবে তখনো বাংলাদেশের পাসপোর্টে হজ করার সুযোগ পেত না বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমান।
এই দূতিয়ালির মাধ্যমেই ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠেয় অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসির সম্মেলনে আমন্ত্রণ পায় বাংলাদেশ। আরব দেশগুলোর তরফে (বিশেষ করে কুয়েতের) বলা হলো চলমান অচলাবস্থা কাটাতে নিজেদের সদিচ্ছা প্রমাণের এটাই সুযোগ বাংলাদেশের। মোক্ষম সময়ে মুজিব বললেন, অবশ্যই আমি এই সফরে যাব। কিন্তু...। বাট...। পাকিস্তানের আগে স্বীকৃতি দিতে হবে বাংলাদেশকে। স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি। ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় সংসদ থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন ভুট্টো। মুজিব গেলেন পাকিস্তান। হাসলেন। ছবি তুললেন। এমনকি ‘বুচার অব বেঙ্গল’ টিক্কা খানের সঙ্গেও হাত মেলালেন (প্রটোকল, পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের বাড়ানো হাত ফেরাতে পারেন না তিনি। সদিচ্ছা প্রমাণ করা বলে কথা)। ফিরতি সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন ভুট্টো। দুদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অংশবলে পাকিস্তান তাদের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের বিচার নিজেরাই করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেয়। বিনিময়ে ফেরত দেয় আটক বাঙালিদের।
কী এনেছেন শেখ মুজিব পাকিস্তানে ওই হাসিমুখের পোজ দিয়ে, কলঙ্কিত সেনানায়কের সঙ্গে হাত মিলিয়ে? ১. স্বাধীন দেশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বীকৃতি ২. জাতিসংঘের সদস্যপদ, চীনের ভেটো পাকিস্তানের অনুরোধে বন্ধ হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাংলায় ভাষণ দিয়ে জাতিসংঘে উদযাপন করলেন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি। ৩. মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি এবং সাহায্য, যদিও সৌদি আরব চীনের মতোই ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের হজের অনুমতি মিলেছে। ৪. আটকেপড়া দুই লাখ বাঙালি সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে আনা এখন এটা বঙ্গবন্ধুর পাপ হয়েছে? ওয়েল, সফল পররাষ্ট্রনীতির সংজ্ঞা তাহলে নতুন করে শিখতে হবে বন্ধুরা। এক ঢিলে এতগুলো পাখি মারার পর বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। দেশ স্বাধীনের তিন বছরের মাথায় এই সক্ষমতা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন তিনি কেন কিংবদন্তি! আজ তার জন্মশতবার্ষিকীতে এই অসাধারণ সাফল্যগাথাটি অবশ্যই আলাদা মর্যাদার দাবি রাখে। মন্দলোক না বুঝে এর সমালোচনা করে। আনুষঙ্গিক পরিপ্রেক্ষিতগুলো তারা কখনো আমলে নেয় না। আমি শুধু গর্বভরে বলি, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!’
লেখক: সাংবাদিক, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট