স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে শাহাদাৎবরণ করতে হয়। এই সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার সময়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক সমালোচক তৈরি হয়। এটি মূলত শুরু হয় স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নিয়ে। সে সময় বঙ্গবন্ধুকে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় নবগঠিত ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলজাসদের। তখনকার কঠোর সমালোচকদের অনেকেই এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উল্টো কথা বলছেন। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভুল স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর নয়, তার শাসনব্যবস্থার সমালোচনা ও বিরোধিতা করেছিলেন।
মুজিববর্ষ শুরুর প্রাক্কালে গতকাল ১৬ মার্চ সোমবার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের (রব) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশের রাজনীতির সীমানা পেরিয়ে আজকে বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণ করছেন। তিনি বলেন, শাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কিছু ভুলত্রুটি থাকলেও নেতা হিসেবে তিনি সবার শ্রদ্ধার। রব বলেন, বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে সাহসী-ত্যাগী, জনগণের কাছে নন্দিত আর কোনো নেতা তখন ছিলেন না। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ৬ দফা ও ১১ দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন ভূমিকার কারণেই আমরা বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা স্থাপন করতে পেরেছিলাম। বঙ্গবন্ধুই দৈন্য দশাগ্রস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ৭ মার্চ মুক্তি সংগ্রামের নির্দেশনা প্রদান করেন। আমরা যেমন বঙ্গবন্ধুর প্রতি আস্থাবান ছিলাম; তেমনি বঙ্গবন্ধুও সিরাজুল আলম খান এবং নিউক্লিয়াসের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন।
জাসদের আরেক অংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাঙালির সংগ্রামের আদর্শের, ইতিহাসের ও নৈতিকতার সোনার খনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই খনি খুললে অনেক মণি, মুক্তা, হীরা-জহরত পাওয়া যায়। এই সোনার খনি খুললে আরও পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, সমাজ, মানবতা ও ধর্ম সম্পর্কে ভাবনা। এই সোনার খনি থেকে বের হওয়া ভাবনা নিয়ে কাজ করলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা হবে। সম্মুখ যাত্রা আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু বিকল্প শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, নির্বাচন ও সশস্ত্র সংগ্রাম অপূর্ব সমন্বয় সাধন করার রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। মহান রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। জাতিকে সাম্প্রদায়িক আলখেল্লা থেকে বের করে এনে সব ধর্মকে বাঙালিতে উজ্জীবিত করে সবাইকে বাঙালি বানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।
জাসদের আরেক অংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আমৃত্যু বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি রাজনীতি এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। দেশপ্রেমে অবিচল ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশের মানুষ এখন তা স্বীকার করে। স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথা ও জাসদের বিরোধিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু একসময় সবকিছু এক্সিকিউট করার দায়িত্ব আওয়ামী লীগের ওপরই ছেড়ে দেন। আওয়ামী লীগের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগ বিশ্বাসের মর্যাদা রাখেনি। ফলে বঙ্গবন্ধু পরীক্ষামূলকভাবে বাকশাল সৃষ্টি করেছেন। আম্বিয়া আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে আমরা যেসব জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা হলো সংবিধানের মূল ভিত্তির ওপর আঘাত হানা হয়েছে। ফলে সেনাশাসকরা ক্ষমতা দখল করেছেন। এর রেষ আমরা এখনো ভোগ করছি। তিনি বলেন, আমি বলব বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শে বিশ্বাস করলে দেশের মানুষের হাতে ক্ষমতা থাকতে হবে। সেটাই করা উচিত বর্তমান সরকারের। আম্বিয়া বলেন, ক্ষমতা এখন প্র্যাকটিক্যালি মানুষের হাতে নেই। ক্ষমতা রাষ্ট্রের কর্মচারীদের হাতে।