সাংবাদিক কাজল নিখোঁজ

থানায় থানায় ঘুরছে পরিবার মামলা নিচ্ছে না

বাবাকে অপহরণের অভিযোগে মামলা করতে কয়েক দিন ধরে রাজধানীর নিউমার্কেট ও চকবাজার থানায় ঘুরছেন নিখোঁজ ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের ছেলে মনোরম পলক। কিন্তু এক থানার পুলিশ আরেক থানার ওপর দায় চাপিয়ে মামলা নথিভুক্ত করছে না বলে অভিযোগ কাজলের পরিবারের।

সাংবাদিক কাজলের ছেলে মনোরম পলক গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাবাকে অপহরণ করার বিষয়ে একটি মামলা করার জন্য কয়েক দিন থেকে ঘুরছি। একবার যাচ্ছি নিউমার্কেট থানায়, আবার যাচ্ছি চকবজার থানায়। এক থানার পুলিশ আরেক থানার ওপর দায় চাপাতে চায়, কিন্তু কেউই মামলা নিচ্ছে না।’

১০ মার্চ থেকে ‘নিখোঁজ’ রয়েছেন সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, কাজল নিখোঁজ নন, তাকে গুম করা হয়েছে। অজ্ঞাত কেউ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। এ আশঙ্কার কথা জানিয়ে কয়েক দিন থেকেই চকবাজার ও নিউমার্কেট থানায় মামলা করতে যাচ্ছেন তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পুলিশ মামলা নিচ্ছে না। ফটোসাংবাদিক কাজল দৈনিক পক্ষকাল নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলেন। ১০ মার্চ বকশীবাজারের বাসা থেকে হাতিরপুলে নিজ কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য বের হয়ে আর বাসায় ফেরেননি। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নম্বর সেদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে।

সহকর্মীদের দাবি, কাজল নিখোঁজ হলেও ফেইসবুকে দেওয়া তার কিছু পোস্ট কে বা কারা মুছে দিয়েছে। ওই পোস্টগুলো যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে আপলোড করা হয়েছিল। পাপিয়ার ডেরায় যাতায়াতকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে সংক্ষুব্ধ হয়ে মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ও পত্রিকাটির প্রতিবেদক আল-আমিনসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর। ওই মামলার দিন থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন সাংবাদিক কাজল।

মামলা না নেওয়ায় হতাশ মনোরম পলক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চকবাজার থানার ওসি বলেছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলের ফুটেজের জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো তারা ফুটেজ হাতে পাননি। আবার কখনো বলছেন, বাবা নিখোঁজ হয়েছেন নিউমার্কেট থানা এলাকায়। তাই মামলা নিউমার্কেট থানায় করতে হবে। কিন্তু নিউমার্কেট থানায় গেলে সেখান থেকে বলা হয়, তারা মামলা নেবে না। এভাবে তারা ঘোরাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবার কারও সঙ্গে বিরোধ বা আর্থিক লেনদেনও ছিল না। কাজেই তিনি স্বেচ্ছায় লুকিয়ে আছেন বা তিনি হারিয়ে গেছেন এমনটা বলার কোনো সুযোগ নেই। আমার ধারণা, কেউ বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। থানা মামলা না নিলে আজকালের মধ্যে আদালতে মামলা করব।’

হাতিরপুলে কাজলের অফিসের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় সন্ধ্যা ৬টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত তাকে অফিসে দেখা গেছে উল্লেখ করে পলক বলেন, ‘আমি বাবার ব্যবহৃত গ্রামীণফোনের কললিস্ট সংগ্রহ করেছি। ওই কললিস্ট অনুযায়ী বাবার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল যুব মহিলা লীগের দুই নেত্রীর সঙ্গে। তার একজন নীলুফা হোসেন নীলু।’

নীলু সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কাজল যেদিন নিখোঁজ হন সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি (কাজল) কোথায় আছেন ও কখন ফিরবেন তা নিয়ে কথা হয়েছে। যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারেও কথা হয়েছিল।’ কাজলের মোবাইল ফোনের কললিস্টে অপু উকিলের নাম থাকলেও নীলু বলেন, ‘শফিকুলের (কাজল) সঙ্গে তার (অপু উকিল) কথা হয়নি। তবে শফিকুল একটি এসএমএস পাঠিয়েছিল অপু উকিলকে।’

জানা গেছে, কাজলের সঙ্গে যুব মহিলা লীগের অনেক নেতাকর্মীর ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের ছবি তুলে দিতেন। যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া গ্রেপ্তারের পর তিনি পাপিয়াসহ যুব মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের কিছু ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করেন।

কাজলের বাসা বকশীবাজার এলাকায়। যা পড়েছে চকবাজার থানা এলাকায়। কাজলের পরিবারের মামলা কেন নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা আসলে মামলা করতে আসেনি। তারা কিছু বিষয়ে খোঁজ নিতে এসেছিল। সাংবাদিক কাজল মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন বেলা ৩টার দিকে। এরপর সন্ধ্যা প্রায় ৭টা পর্যন্ত  তিনি হাতিরপুল এলাকার অফিসে ছিলেন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ।’

ওসি আরও বলেন, ‘কাজলের পরিবার যে মামলা করতে এসেছে তাতে মামলা নেওয়ার মতো উপাদান ছিল না। তাই আমরা মামলা নিইনি। এরপরও তারা যদি মামলা করতে চায় আমরা মামলা নিয়ে নেব।’